তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিলঃ তারেক রহমান

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

বিগত সরকারের সময়ে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভায় দেয়া বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা আজ এখানে একত্র হতে পেরেছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা আমাদের সকলের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন। আমরা আজ এখানে একত্র হতে পেরেছি সেই মানুষগুলোর ত্যাগের বিনিময়ে, যারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ একাত্তর সালে যেভাবে দেশকে স্বাধীন করেছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে বাংলাদেশের মানুষ রক্ষা করেছে তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখানে বহু মুরব্বি উপস্থিত আছেন, যারা কালের সাক্ষী—শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় কীভাবে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র রচিত হয়েছে। বহু ভাই-বোনেরা এখানে উপস্থিত আছেন—যারা কালের সাক্ষী দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় কীভাবে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করা হয়েছিল। একটু আগে আমি আমার বক্তব্যে বলেছি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উদাহরণ দিয়ে যে, কীভাবে এই দেশে তথাকথিত উন্নয়নের নামে দেশ থেকে মানুষের অর্থ লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই।’
ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা আপনারা কি আছেন আমার সঙ্গে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে? প্রিয় ভাই-বোনেরা আমরা সারা বাংলাদেশের কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে চাই। যদি ইনশাআল্লাহ আপনারা আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করেন, করতে পারেন—আমরা ইনশাআল্লাহ সারা বাংলাদেশের কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারবো। দাঁড়াতে চান কৃষকদের পাশে?’
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা আমরা দেখেছি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় যেভাবে খাল খনন করা হয়েছিল সারা বাংলাদেশে, সেই খাল খনন করার মাধ্যমে কৃষকদের সেচ সুবিধাসহ মানুষের পানির সমস্যার সমাধান হয়েছিল।’
নির্বাচিত হলে আবারও খাল খনন কর্মসূচি চালু করতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা বিএনপি ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখের ভোটে নির্বাচিত হলে আমরা আবার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে চাই। কারা কারা শুরু করতে চান? ’
তিনি বলেন, আমরা দেশে খাল কাটবো। দেশের নদীতে পানি নিয়ে আসবো। খালে বিলে পানি নিয়ে আসব। কেন? আপনাদের মনে আছে—কয়েক বছর আগে কীভাবে ওইপাশ থেকে পানি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সারা সিলেট শহর ভেসে গিয়েছিল বন্যার পানিতে। মনে আছে? সে জন্যই আমরা বলেছি, একটি কথা। আমরা দেখেছি গত ১৫/১৬ বছর কীভাবে এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেজন্যই আমি বলেছি- দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রিয় ভাই বোনেরা—আমি আরেকটি কথা বলেছিলাম, যখন স্বৈরাচার এই দেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। সেই কথাটা ছিল, টেইকব্যাক বাংলাদেশ। মনে আছে? আমরা টেইক ব্যাক বাংলাদেশের অর্ধেক পথে, হাফ পথে এসে দাঁড়িয়েছি। দেশকে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত করেছি। আমরা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছি। এখনো সেই যাত্রা শুরু হয়নি। ১২ তারিখে ধানের শীষকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সেই যাত্রা শুরু হবে।’
“কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকাবে আপনাদেরকে- বোঝেন এবার”
এক পর্যায়ে জনসভায় শ্রোতা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, “আপনি কাবা শরিফে গেছেন, কাবা শরিফের মালিক কে?’ ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আল্লাহ’।
বিএনপি চেয়ারম্যান জানতে চান, “আমরা মুসলমান সবাই, এই দিন-দুনিয়ার আমরা যে এই পৃথিবী দেখি, এই পৃথিবীর মালিক কে?’। উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’।
তারেক রহমান পুনরায় প্রশ্ন করেন, “এই সূর্য নক্ষত্র যা দেখি তার মালিক কে?” উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’। বিএনপি চেয়ারম্যান প্রশ্ন করেন, “বেহেস্তের মালিক কে?” জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আল্লাহ’। বিএনপি চেয়ারম্যান এবার জানতে চান, ‘দোজখের মালিক কে?’ উত্তর আসে, ‘আল্লাহ’।
এসময় উপস্থিত জনতাও সমস্বরে ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ বলে জবাব দিচ্ছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, “আপনারা সকলেই সাক্ষী দিলেন, দোজখের মালিক আল্লাহ; বেহেস্তের মালিক আল্লাহ, এই পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে নির্বাচনের আগেই একটি দল ‘এই দেব, ওই দেব বলছে’; টিকেট দেব বলছে না?
“যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে, শেরকি করা হচ্ছে, হচ্ছে না? যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু আল্লাহর, একমাত্র সবকিছুর অধিকার- উপরে আল্লাহর অধিকার।
“কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকাবে আপনাদেরকে- বোঝেন এবার।”
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “শুধু ঠকাচ্ছেই না মানুষকে, যারা মুসলমান তাদেরকে শেরকি করাচ্ছে তারা; নাউজুবিল্লাহ। প্রিয় ভাই-বোনেরা, কেউ কেউ বলে অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি- এবার একে দেখেন।
“প্রিয় ভাই-বোনেরা, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, যে যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাদের ভূমিকার কারণে এই দেশের লক্ষ লক্ষ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছে। এই দেশের লক্ষ লক্ষ মা বোনেরা- তাদের সম্মানহানি হয়েছে; কাজেই তাদেরকে তো বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যেই দেখেই নিয়েছে।”
তারেক বলেন, “এই কুফরির বিরুদ্ধে, এই হঠকারিতার বিরুদ্ধে, এই মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদেরকে ঐ যে টেক ব্যাক বাংলাদেশে থাকতে হবে।
“আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি, এখন মানুষের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু ভোট, শুধু কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলে হবে না; মানুষকে সাবলম্বী করে নিজের পায়ে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ বাংলাদেশের মানুষ যাতে ঠিকভাবে ভালোভাবে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারে। প্রত্যেকটি মানুষ যাতে নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সেটিই হচ্ছে টেক ব্যাক বাংলাদেশ।”
এদিকে সিলেটের সমাবেশ শেষ করে মৌলভীবাজারের পথে রওয়ানা দিয়েছেন তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় গিয়ে সিলেটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি বিগত ১৫-১৬ বছরে উন্নয়নের নাম করে কীভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। আজকে এই যে ঢাকা থেকে সিলেট বা সিলেট থেকে ঢাকার যে মহাসড়ক; ২০০৫ সালে আমি এসেছিলাম সুনামগঞ্জে, বন্যা হয়েছিল। আমার আসতে লেগেছিল সাড়ে ৪ ঘণ্টার মতন।’
‘কিন্তু আজ আজ আমরা দেখি ১০ ঘণ্টার মতন সময় লাগে। সিলেটের এই পূণ্যভূমির মানুষ বহু মানুষ আছেন, যারা লন্ডনে যাতায়াত করেন; লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না প্লেনে করে যেতেও-এই হচ্ছে আজকে উন্নয়নের ফিরিস্তি।’
তিনি বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছরে আমরা দেখেছি, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে ব্যালট বক্স ছিনতাই হয়েছে; কীভাবে আমি-ডামির নির্বাচন হয়েছে; কীভাবে নিশি রাতের নির্বাচন হয়েছে। এবং এই নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে, তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকারকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা আমাদের সকলের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল।’
সিলেট নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যোগ দেন তিনি। জনসভাকে ঘিরে দলের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা জনতার ঢল নেমেছে মাদ্রাসা মাঠে।
বিএনপির চেয়ারম্যান হাস্যোজ্জ্বল মুখে হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। মঞ্চে তারেক রহমানের সঙ্গে তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও রয়েছেন।
এর আগে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলওয়াতের মধ্য দিয়ে এই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এর আগে সমাবেশ ঘিরে সকাল থেকেই সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে জনসভাস্থলে আসতে শুরু করেন নেতা–কর্মীরা। ব্যানার, ফেস্টুন ও দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন তারা। অনেকে রাতে এসেই অবস্থান নেন। দূরের উপজেলাগুলো থেকে নেতাকর্মীরা একদিন আগেই চলে এসেছেন সিলেটে। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে এ জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এদিকে অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে যোগ দেন তারেক রহমান। সিলেটের একটি হোটেলে এ মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তারেক রহমান তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গতকাল রাত ৮টার দিকে বিমানে সিলেট পৌঁছান তারেক রহমান। পরে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন তিনি। এরপর তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিরাইমপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে উপস্থিত নেতা–কর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *