শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের নজরদারি ও সংস্কার কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়। তবে এরপরও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তের দাবি উঠছে।

এমন প্রেক্ষাপটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, এর আগে ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপুল অঙ্কের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডার-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস, ঠিকাদার নির্বাচনে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া টেন্ডার অনুমোদনের আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ, কাজ সম্পন্ন না করেও ভুয়া ভাউচার ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন এক সাবেক সচিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে মাসুদ রানা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতে তাঁকে একাধিকবার বদলি করা হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নিজের নামে, তাঁর স্ত্রী এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুলশানে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, রামপুরা-বনশ্রীর ব্লক-ডিতে একটি পাঁচতলা বাড়ি, বনশ্রীর এফ ব্লকে তাঁর স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, বসুন্ধরা সিটিতে দুটি বাণিজ্যিক দোকান এবং মোহাম্মদপুরের বাবর রোড এলাকায় প্রায় ১০ কাঠা জমিসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক দশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, প্রকৃত বাজারমূল্য এবং সম্পদ অর্জনের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সম্পদ বিবরণী, ভূমি রেকর্ড, দলিলপত্র ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তের দাবি
অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করা সম্ভব। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ অবস্থায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্পের প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, কাজের বাস্তব অগ্রগতি, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের মালিকানা ও উৎস যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাঁকে খুদে বার্তা (SMS) পাঠানো হলেও প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা গেলে প্রকৃত ঘটনা যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নজরদারি ও জবাবদিহি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখনও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

এমন প্রেক্ষাপটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।