শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
দেশের টেকসই শিল্পায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের ক্ষতিকারক বর্জ্য পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন।
আজ (সোমবার) ঢাকায় সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) আইজিসিআরটি -এর সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার ও অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক সাবরিনা মোস্তফা’র “Process development for the treatment of wastewater from textile industries in Bangladesh” শীর্ষক গবেষণার ওপর আলোচনায় তিনি এই গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান সচিব বলেন, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের বর্জ্য পানি (Effluent) পরিবেশসম্মত উপায়ে ট্রিটমেন্টের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং বিজিএমইএ (BGMEA) ও বিকেএমইএ (BKMEA)-এর মতো ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সাসটেইনেবিলিটি ডিপার্টমেন্টকে যৌথভাবে গবেষণা ও প্রসেস ডেভেলপমেন্টের কাজ করতে হবে। প্ল্যান্টের বর্জ্য পানি সঠিকভাবে পরিশোধন নিশ্চিত করতে বর্জ্য পানি নির্গমনের পূর্ববর্তী পর্যায় থেকেও যেন কার্যকর ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়ার আওতায় আনা যায়, সে লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী এবং দক্ষ গবেষণা দল (R&D) গঠন করে কাজ করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
শিল্পে কেমিক্যাল ডাইসের ব্যবহার কমিয়ে দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদানের প্রয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বিজ্ঞান সচিব আরও বলেন, দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় এটি একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। এ উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে ডাইস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) সুবিধা সমৃদ্ধ স্থানীয় রাসায়নিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন তিনি।
এছাড়া, টেক্সটাইল ডাইং প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভস্থ এবং সুপেয় পানির অতিমাত্রায় ব্যবহার রোধ করে নূন্যতম পানি ব্যবহারের প্রযুক্তি আবিষ্কার ও প্রয়োগের কথা জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব। তিনি বলেন, ডাইং পরবর্তী পানি কিংবা প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য পানিকে পুনরায় ব্যবহার বা রিসাইক্লিং করার জন্য নতুন গবেষণার উদ্ভাবনী ফলাফল শিল্পখাতে প্রয়োগ করতে হবে।
বিসিএসআইআর, দেশীয় কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এবং তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও টেকসই গবেষণার মাধ্যমে দেশের টেক্সটাইল শিল্পকে বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং অধিক লাভজনক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞান সচিব আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচনা অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এ ধরনের গবেষণা উদ্যোগ টেক্সটাইল শিল্পের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী,পরিবেশবান্ধব এবং যুগান্তকারী উদঘাটন হবে বলে আমরা মনে করি। দ্রুত পাইলটিং হয়ে এটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে আনয়নের জন্য বিকেএমইএ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
গবেষক সাবরিনা মোস্তফা তার উপস্থাপনায় বলেন,
বিষাক্ত ও ক্ষতিকর রঙ অপসারণের প্রচলিত ব্যয়বহুল ডি-কালারিং এজেন্টের বিকল্প হিসেবে স্থানভিত্তিক সহজলভ্য উপাদান-যেমন চালের তুষ ও তুষের গুঁড়ো-ব্যবহারের ওপর নতুন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রযুক্তির মাধ্যমে টেক্সটাইল বর্জ্য পানি শোধন প্রক্রিয়া একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হবে, অন্যদিকে ২০২৪ সালের সরকারি পরিবেশগত নির্দেশিকা (রঙযুক্ত উপাদান বা ইউনিট ১৫০-এর মধ্যে রাখা) সফলভাবে ও সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এই উদ্ভাবনী উদ্যোগকে শিল্পক্ষেত্রে বাস্তবে রূপ দিতে ‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ইনোভেশন সেন্টার’-এর মাধ্যমে ড. নরশাদ হকের কারিগরি ও গবেষণা সহযোগিতায় প্রযুক্তির ফিল্ড পাইলটিং এবং প্রাথমিক প্র্যাকটিস শুরু করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সিস্টেমেটিক ও সুনির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ সহায়তার মাধ্যমে এ প্রযুক্তিকে দেশের টেক্সটাইল শিল্পে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া হতে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে যুক্ত হয়ে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নওশাদ হক এই গবেষণার বিষয়বস্তুর ওপর মতামত দিয়ে বলেন, দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে কম খরচে টেক্সটাইল বর্জ্য পানি থেকে রঙ অপসারণের এ পদ্ধতি বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতকে আরও সবুজ, পরিবেশবান্ধব ও বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণা উপস্থাপনা ও আলোচনায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. সৈয়দা নওশিন পর্ণিনী, বিসিএসআইআর এর চেয়ারম্যান ড.সামিনা আহমেদ, বিজেএমইএ এর প্রতিনিধি এবং এইচ এন্ড এম এর সাসটেইনেবিলি ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।