শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনে গঠিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) থাকছে না। এই দুই ইউনিটকে একীভূত করে নতুন একটি ইউনিট করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নতুন এই ইউনিটের নাম ঠিক করা হয়েছে স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)। এর প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত আইজিপি। পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়ে শিগগির নির্দেশনা দেবে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র এসব তথ্য আজকের পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছে। সূত্র বলেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিটিটিসি ও এটিইউ গঠন করা হয়েছিল। সে সময় জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনের নামে বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রম চালানো হয়। সিটিটিসি ও এটিইউর কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ দুটি ইউনিটের বিরুদ্ধে অনেককে গোপন বন্দিশালায় আটক রাখারও অভিযোগ আছে। এসব কারণে বর্তমান সরকার এ দুটি ইউনিটকে একীভূত করে নতুন একটি ইউনিট করার উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর নতুন ইউনিটের জন্য সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
সূত্র আরও জানায়, সিটিটিসি ও এটিইউ একীভূত করে এই দুটি ইউনিটের জনবলও একীভূত করা হবে। দুই ইউনিটের অর্গানোগ্রাম একীভূত করে নতুন অর্গানোগ্রাম ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। ইউনিটে নতুন কোনো পদ সৃষ্টি করা হবে না। বর্তমান এটিইউর অতিরিক্ত আইজিপি প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটের প্রধান হবেন। সিটিটিসির প্রধানও নতুন ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত হবেন। নতুন ইউনিটের প্রধান কার্যালয় হিসেবে মিন্টো রোডে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের চত্বরে সিটিটিসির ভবনটি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটিইউর নিজস্ব কোনো ভবন নেই। বারিধারায় ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চলছে। তাই প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটের কার্যক্রম সিটিটিসি ভবন এবং আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হবে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সিটিটিসি ও এটিইউ একীভূত করার একটি আলোচনা বিভিন্ন সময় এসেছে। এ দুটি ইউনিটের কাজের ধরন একই, তাই কখনো কখনো কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন, সিটিটিসিকে এটিইউর অধীনে আনা যায়। সেটা আলোচনায় আছে।
সূত্র জানায়, দেশে ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালে ডিএমপির একটি বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি গঠন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর কাজের এলাকা ঢাকা মহানগর। এটি সাতটি সাব-বিভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে—স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ (সোয়াট), সাইবার ক্রাইম তদন্ত বিভাগ, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও বিশেষ প্রশিক্ষিত কে-নাইন টিম (k-9)। ঢাকায় বড় কোনো ইভেন্ট হলে সোয়াট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এটি অনেক ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযান চালিয়েছে, জঙ্গি নেতা ও উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর ওই বছরে সিটিটিসি কল্যাণপুর, শাহ আলী, বংশাল, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, আশকোনা, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের পাতারটেক, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তখন বলেছিল, ওসব বাড়ি ‘জঙ্গি আস্তানা’। অভিযানে কল্যাণপুরে ‘নব্য জেএমবির’ নয়জন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় তিনজন, গাজীপুরের পাতারটেকে সাতজনসহ বিভিন্ন স্থানে অনেকে নিহত হয়। পুলিশ নিহত ব্যক্তিদের জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
সিটিটিসির ওই সব অভিযান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কল্যাণপুরে ‘জাহাজবাড়িতে’ ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়েছে। সিটিটিসি নতুন ইউনিটে একীভূত হচ্ছে। ডিএমপির সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা আর থাকছে না।
সিটিটিসি গঠনের এক বছর পর ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ গঠন করেছিল। সারা দেশে কাজ করা এই ইউনিট পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলে। এই ইউনিটের প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউর কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। এ দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম, আটক রাখা, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক এবং বর্তমান সংসদের বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। নির্যাতন করা হতো।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও সিটিটিসি ও এটিইউর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও এগুলোর গোপন বন্দিশালা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার মনে করছে, সিটিসিটি ও এটিইউ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ দমনের নামে অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছে। ইউনিট দুটির অনেক দুর্নাম রয়েছে। তাই এই দুটি ইউনিট একীভূত করে নতুন ইউনিট করা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ শব্দসংশ্লিষ্ট নামের কোনো ইউনিট পুলিশে থাকবে না।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গতকাল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের করা গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব ইউনিট আমরা আগেই বন্ধ করতে বলেছি। কারণ, এসব ইউনিট হন্তক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। তাদের যেসব সদস্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় এনে এই ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অপরাধ দমনের জন্য নতুন বিশেষ কোনো ইউনিট করার দরকার নেই। পুলিশকে দক্ষ করলেই হবে।