আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জেরে হঠাৎই ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে তেহরানসহ ইরানের পাঁচটি প্রধান শহরে যৌথভাবে ভয়ংকর এই হামলা চালায় মিত্র দুই দেশ।
হামলায় বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বাসভবনকে। পাশাপাশি মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে ইরানের মন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের বাসভবন, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থাপনাতেও। এরই মধ্যে এসব হামলায় ইসরায়েল ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
অন্যদিকে সফল আরেক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও প্রাণ হারিয়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২।
তবে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও সূত্রগুলোর এমন দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে তিনি বলেছেন, ‘আমি যতটুকু জানি, সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বেঁচে আছেন।’
তবে হামলায় তাদের দুজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি। আর বাকি সবাই বেঁচে আছেন জানিয়ে আরাগচি বলেছেন, ‘আমরা সম্ভবত এক বা দুইজন কমান্ডারকে হারিয়েছি, কিন্তু এটি কোনো বড় সমস্যা নয়। উচ্চপদস্থ সব কর্মকর্তা বেঁচে আছেন। সবাই যার যার অবস্থানে আছেন এবং আমরা এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছি। সবকিছু ভালো আছে।’তাছাড়া, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও নিরাপদে আছেন বলে এক্স পোস্টে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন তার নির্বাহী ডেপুটি মো. জাফর কিয়ামফানা। আর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান টেলিগ্রামে লিখেছেন, এইবারও তাদের হত্যাচেষ্টা সফল হয়নি।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের দাবি অনুযায়ী, ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি হামলায়। রয়টার্সকে সূত্রগুলো বলেছে, হামলার শুরুতেই প্রাণ হারান তারা।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ জানিয়েছে, তেহরানে তারা যে সব জায়গায় হামলা চালিয়েছে সেখানে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তার জড়ো হয়েছিলেন।
এদিকে শুধু ইরানের শাসকগোষ্ঠীই নয়; ইসরায়েলি হামলার টার্গেটে পরিণত হয়েছে কোমলমতি শিশুদের স্কুলও। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫১ শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হামলাটি চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারে তায়্যিবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় লক্ষ্যবস্তু হয়। হামলায় নিহত ৫১ শিক্ষার্থীর সবার বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।
হামলার সময় স্কুলটিতে প্রায় ১৭০ ছাত্রী উপস্থিত ছিল। হামলার পর অনেক শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে বলেও জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ইরানে হামলার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধাভিযান’ চালিয়েছে। আমরা বারবার একটি চুক্তি চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা জ্বালিয়ে দিতে যাচ্ছি। এটা পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে।
অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ এই হামলার পর চুপ করে বসে নেই ইরান। তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেওয়া শুরু করেছে তারাও। ইসরায়েলে বৃষ্টির মতো আঘাত হানছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। শুধু ইসরায়েলেই নয়; যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলা শুরু করেছে দেশটি। এরই অংশ হিসেবে কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে ইরান।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ইরান থেকে ছোড়া অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় শনাক্ত করা হয়েছে। এই ভয়াবহ পাল্টা হামলার পর পুরো ইসরায়েলজুড়ে বিপদ সংকেত বা সাইরেন বেজে উঠেছে এবং নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইডিএফের পক্ষ থেকে জারি করা জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় ধরনের ঢেউ আমাদের সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসছে। আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিমান বাহিনী এই হুমকিগুলো প্রতিহত করার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছে।
আইডিএফ আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নিখুঁত নয়, তাই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াতে জনগণকে অবিলম্বে আইডিএফের সুরক্ষা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তেল আবিবসহ ইসরায়েলের প্রধান শহরগুলোতে এখন মুহুর্মুহু সাইরেন আর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা দেশটিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এরই মধ্যে এক বিবৃতিতে হুঙ্কার দিয়েছে, শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।