ডুয়েটে নতুন ভিসির আনুষ্ঠানিক অভিষেক ফুলেল সংবর্ধনায় বরণ, সরলো ব্যারিকেড; সংকট নিরসনে সংলাপের প্রত্যাশা

মোঃ নূরুল ইসলাম সবুজ গাজীপুর প্রতিনিধিঃ

টানা আন্দোলন, ব্লকেড, ‘লাল কার্ড’ ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই অবশেষে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন নবনিযুক্ত ভিসি, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। শিক্ষার্থীশূন্য ও প্রায় নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসে বৃহস্পতিবার তার প্রবেশ, ফুলেল সংবর্ধনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ডুয়েট ক্যাম্পাসে নতুন মাত্রার আলোচনা শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে শিক্ষকদের একাংশ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত ভিসি। নিয়োগ পাওয়ার প্রায় আট দিন পর তিনি প্রথমবারের মতো প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালনে অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ডুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া জানান, ক্যাম্পাসের শহীদ আবু সাঈদ ভবনে অবস্থিত ভিসির কার্যালয়ে গিয়ে নিজ আসনে বসেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডীন, বিভাগীয় প্রধান, ইনস্টিটিউটসমূহের পরিচালক, শিক্ষক সমিতি, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও কর্মচারী সমিতির নেতারা পর্যায়ক্রমে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। উপস্থিত ছিলেন সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনও।

জানা গেছে, এর আগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর দপ্তরের সভাকক্ষে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন নবনিযুক্ত ভিসি। পরে শিক্ষক ও কর্মচারীদের একটি অংশ তাকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন।

ভিসির আগমনের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা বিভিন্ন অবরোধমূলক কাঠামো, পানির ট্যাংক, আসবাবপত্র ও ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে দেখা যায় কর্মচারীদের। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

তবে এ সময় ক্যাম্পাসে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল ত্যাগ করে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। বুধবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে। ফলে বৃহস্পতিবারের পুরো পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই নীরব, সতর্কতাপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত।

পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নবনিযুক্ত ভিসি, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ‘দেশের অন্যতম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ডুয়েটের অভিভাবকত্ব পেয়ে আমি প্রথমেই মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। গ্লোবাল ভিলেজের সুযোগসমূহ কাজে লাগিয়ে সকলের সহযোগিতায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা, উদ্ভাবন এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশনের মাধ্যমে ডুয়েটকে বিশ্বের দরবারে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই।’

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

উল্লেখ্য, গত ১৪ মে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সিলেট-এর ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

দীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মজীবনে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডীন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, হল প্রভোস্ট ও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরি ও’কনর প্রসেস সেফটি সেন্টারে ভিজিটিং রিসার্চ স্কলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতের শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্নের পর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশি-বিদেশি পিয়ার রিভিউড জার্নালে তার ৩৫টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৯০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।

অন্যদিকে, ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভিসি নিয়োগের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, ব্লকেড ও ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচি পালন করেন। পরে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়।

গত রোববার ভিসি নিয়োগ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই ঘটনায় অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। আহত হন কয়েকজন পুলিশ সদস্যও। এ ঘটনায় গাজীপুর সদর মেট্রো থানায় সরকারি কাজে বাধা, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডুয়েট শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি প্রতিনিধি দল গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, মোঃ ইসরাইল হাওলাদারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা বলেন, ডুয়েটে চলমান আন্দোলনকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি তাদের দৃষ্টিতে বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনটি মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত দাবির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং সাংগঠনিকভাবে ছাত্রশিবির এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, মোঃ ইসরাইল হাওলাদার বলেন, ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মূলত তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতেই সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তারা জানিয়েছেন, আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে তাদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। পুলিশ সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখতে কাজ করছে।

বর্তমানে ডুয়েট ক্যাম্পাসে দৃশ্যত স্বাভাবিকতা ফিরতে শুরু করলেও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থান কোন দিকে মোড় নেয়-তা নিয়েই শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে নানা আলোচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *