যুদ্ধের মাঝেই আগুন : আমেরিকার বিমানবাহী জাহাজ জেরাল্ড আর ফোর্ডের ভেতরে অসন্তোষ?

Spread the love

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ জেরাল্ড আর ফোর্ডে হঠাৎ আগুন লাগে। ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে। কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছে এই আগুন নেহাত দুর্ঘটনা নাও হতে পারে। জাহাজের ভেতরে থাকা কিছু নাবিক নাকি ইচ্ছা করেই আগুন লাগিয়েছে।
নাবিকদের অভিযোগ, তারা এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যার শেষ দেখতে পাচ্ছে না। তাই তারা চায় এই অঞ্চলের যুদ্ধ থেমে যাক। সেই ক্ষোভ থেকেই আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই খবর জানিয়েছে তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি।
তাসনিমের সূত্র আরো বলছে, জাহাজটির ভেতরের পরিবেশ এখন বেশ অস্থির। দীর্ঘদিন টানা সমুদ্রে থাকার ক্লান্তি। যুদ্ধের চাপ। তার সাথে প্রযুক্তিগত নানা ঝামেলা। সব মিলিয়ে নাবিকদের মানসিক অবস্থা নাকি খুব একটা ভালো নেই। ফলে এই মুহূর্তে জাহাজটি পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় আছে কিনা সে প্রশ্নও উঠছে।
মার্কিন জাহাজটির নাম শুনলেই বোঝা যায় এটি সাধারণ কোনো যুদ্ধজাহাজ নয়। মার্কিন নৌবাহিনী ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেরাল্ড আর ফোর্ড আসলে আমেরিকার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ। প্রায় তেরো বিলিয়ন ডলার খরচ করে এটি বানানো হয়েছে। নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালে। পরে ২০১৩ সালে জাহাজটি প্রথম পানিতে ভাসানো হয়। আর আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেয় ২০১৭ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই কমিশনিং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি হিসেবেই এখন এটি পরিচিত।
জেরাল্ড আর ফোর্ড আসলে এক চলমান সামরিক ঘাঁটি। এই বিশাল জাহাজে প্রায় সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মতো নাবিক ও বিমানচালক একসাথে কাজ করেন। জাহাজের ডেকে একসাথে প্রায় সত্তরের কাছাকাছি যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার রাখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে এফ এ আঠারো সুপার হরনেট যুদ্ধবিমান। ই এ আঠারো জি গ্রোলার ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান। ই টু ডি হকআই নজরদারি বিমান। আর এম এইচ ষাট ধরনের হেলিকপ্টারও থাকে। এই বিশাল বহর নিয়েই জাহাজটি সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় এবং যেখানেই যায় সেখানেই এক ধরনের ভাসমান বিমানঘাঁটি তৈরি করে।
তবে এত আধুনিক প্রযুক্তির মাঝেও এই জাহাজের এক অদ্ভুত সমস্যার কথা বহুদিন ধরেই আলোচনায় আছে। সেটি হলো টয়লেট বিপত্তি। জাহাজটিতে প্রায় ছয়শ পঞ্চাশটি টয়লেট রয়েছে। কিন্তু এগুলোর কাজ অনেক সময়ই বন্ধ হয়ে যায়। কারণ পুরো ব্যবস্থাটি ভ্যাকুয়াম পাইপের ওপর নির্ভর করে তৈরি। কোথাও একটু সমস্যা হলেই একসাথে অনেকগুলো টয়লেট বন্ধ হয়ে যায়। কখনো কখনো নাবিকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যে দুই শতাধিকবার মেরামতের পর এ ধরনের ঘটনাও থামেনি। সমস্যাটা এতটাই বড় যে কখনো কখনো পুরো নর্দমা ব্যবস্থা পরিষ্কার করতে বিশেষ অ্যাসিড ব্যবহার করতে হয় যার খরচ কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।
এই জাহাজে আবার আলাদা ধরনের টয়লেট ব্যবস্থাও রয়েছে। পুরোনো জাহাজের মতো ইউরিনাল নেই। সবই বসে ব্যবহার করার ব্যবস্থা। কারণ জাহাজটিকে নারী ও পুরুষ উভয় নাবিকের জন্য একইভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে, সাম্প্রতিক আগুনের ঘটনায় মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আগুনটি যুদ্ধের কারণে হয়নি। জাহাজের ভেতরের একটি অংশে আগুন লাগে এবং তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কয়েকজন নাবিক আহত হলেও তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে লোহিত সাগরে অবস্থানকালে যখন জাহাজটি ইরানকে ঘিরে সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে মোতায়েন ছিল।
তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা থামেনি। কেউ বলছে দুর্ঘটনা। কেউ বলছে ভেতরের অসন্তোষ। বিশাল এই যুদ্ধজাহাজে হাজার হাজার মানুষ মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটায়। যুদ্ধের চাপের সাথে প্রযুক্তিগত ঝামেলা যখন যোগ হয় তখন সেই চাপ কখনো কখনো বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসতেও পারে। আর তখন দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজও হঠাৎ করেই মানুষের ক্লান্তি আর ক্ষোভের গল্প বলে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *