শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য আলোচনার কথা বললেও, তা অস্বীকার করেছে তেহরান।
ট্রাম্পের আলোচনার কথা ও ইরানের তা অস্বীকার করার মধ্যেই মঙ্গলবার ইসরাইলের ওপর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে তেল আবিবে বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আহত হয়েছে কয়েকজন।
এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ইসরাইলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিবে ভবনের ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে। উদ্ধার কর্মীরা চারটি আলাদা স্থানে অন্তত চার জনকে সহায়তা করছেন। তাদের আঘাত তুলনামূলক হালকা বলে জানা গেছে।
তেহরান থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
তেল আবিবের মেয়র রন হুলদাই জানান, অভিজাত এক এলাকায় একটি ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এএফপি’র ভিডিওতে তিনতলা একটি ভবনের সামনের অংশ ছিন্নভিন্ন অবস্থায় দেখা গেছে।
কয়েকটি ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এটি ক্লাস্টার মিউনিশন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে। এতে তিন থেকে চারটি ওয়ারহেড ছিল। প্রতিটিতে প্রায় ১০০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা হচ্ছিল।
এর আগে ইরানী গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান দুটি গ্যাস স্থাপনা ও একটি পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে, ট্রাম্প জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি থেকে সরে এসে যুদ্ধ বন্ধে ‘খুব ভালো’ আলোচনা চলছে বলে দাবি করেন।
ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন এক ‘উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির’ সঙ্গে কথা বলছে।
তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে সমাধান না হলে, ‘আমরা আমাদের মতো করে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাব’ বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ জানান, কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
তার ভাষায়, ট্রাম্প তেল ও আর্থিক বাজার প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের পর শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। তেলের দামও সাময়িকভাবে কমে যায়। এর আগে, তিনি হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। তা না হলে, অর্থাৎ ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে তিনি দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার পাকিস্তানে ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। এতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যোগ দিতে পারেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কারোলিন লিভিট বলেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত, এ সব বৈঠক নিয়ে অনুমানই থাকবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, কিছু ‘বন্ধু দেশ’ যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার আগ্রহের বার্তা দিয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো আলোচনা হয়নি।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানান, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছে বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে ইরান ও লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন নেতানিয়াহু।
তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আইডিএফের সাফল্য কাজে লাগিয়ে একটি চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।’
মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরাইলের বোমাবর্ষণ চলতে থাকে।
রাজধানীর দক্ষিণে বশামুন এলাকায় ইসরাইলের এই হামলায় দুই জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এএফপি’র ছবিতে ধ্বংসস্তূপে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে। উদ্ধার কর্মীরা ধ্বংসাবশেষে আটকে পড়াদের খুঁজছেন।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সার্ভিস স্টেশনেও হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের হামলায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত ও লক্ষাধিক বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৩ হাজার ২৩০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০৬ জন বেসামরিক নাগরিক।
তবে এএফপি স্বাধীনভাবে এ সব তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
সোমবার ট্রাম্প বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি থেকে সরে আসায় প্রতিবেশী দেশগুলো কিছুটা স্বস্তি পায়।
এর আগে তেহরান হুমকি দিয়েছিল যে তারা নৌ-মাইন পেতে দেবে এবং অঞ্চলজুড়ে বিদ্যুৎ ও পানির স্থাপনায় হামলা চালাবে। আর এমনটা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটনের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গ্যারেট মার্টিন বলেন, ‘ট্রাম্প হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলের জন্য পরিচিত। তার কৌশল আছে, না কি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত— বুঝা কঠিন।’
এদিকে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আরও জোরদার হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। এটি বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের পথ।
পাশাপাশি উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনা, মার্কিন দূতাবাস ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে তেহরান।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের ঘাটতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
সংঘাতের কারণে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর তা কিছুটা কমে আসে।