শুভদিন অনলাইন রিপোর্টারঃ
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার পর, মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে তেহরান।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনাকে সংঘাত অবসানের চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ‘খুব ভালো ভিত্তি’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি সোমবার জানান, ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন।
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হলেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও বিশ্বের তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর এখনো সমাধান আসেনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার জানায়, উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছে। পারমাণবিক ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পৃথক কর্মী দল গঠন করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী নিঃশর্তভাবে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি জানান। তবে ইরান আবারও এর কড়া বিরোধিতা করেছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার জানায়, ‘হরমুজ প্রণালী কখনোই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।’
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হয়। তবে লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে শনিবার আবারও প্রণালীটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয় তেহরান।
জব্দ সম্পদ-
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা জানান, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং ‘ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে’ হরমুজ প্রণালীর বিষয়ে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মঙ্গলবার জানায়, চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের জব্দ সম্পদ ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
তবে ভ্যান্স বলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে এখনো ইরানের কোনো সম্পদ অবমুক্ত করা হয়নি। ভবিষ্যতে তা করা হলে, সেই অর্থ সয়াবিনের মতো মার্কিন পণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করা হবে, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে নয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতন ঘটে। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের মুখে রয়েছে ইরান।
সুইজারল্যান্ডে সপ্তাহের শেষে শুরু হওয়া এ আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশা জাগিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমিয়েছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলা এ আলোচনার লক্ষ্য নবায়নযোগ্য ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে একটি চূড়ান্ত দলিল প্রস্তুত করা।
চুক্তিটিকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা মঙ্গলবারও অব্যাহত ছিল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সুইজারল্যান্ডের আলোচনা শেষে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তান সফরে যাবেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর শুরু করারও কথা রয়েছে। তার মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, সফরে তিনি চুক্তি এবং ‘হরমুজ প্রণালীতে পূর্ণ, অবাধ ও নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা’ নিয়ে আলোচনা করবেন।
আলোচনায় অগ্রগতি-
এর আগে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা ‘৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপ’-এ সম্মত হয়েছেন।
মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো জানায়, ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে ‘ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে’ একটি যোগাযোগ চ্যানেলও চালু করা হয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, ইরান জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশ করতে দেবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি।’
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় এসব পরিদর্শন শুরু হয়েছিল। পরে ট্রাম্প ২০১৮ সালে ওই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর ইরান এসব পরিদর্শন স্থগিত করে।
এরপর থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকরা হামলার শিকার স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করতে পারেননি। ফলে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয়।
তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। তবে শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার নিয়ে তারা অনড় অবস্থানে রয়েছে।
লেবানন প্রসঙ্গেও, যা আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তেহরান জোর দিয়েছিল, ইসরাইল ও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত বন্ধে একটি সংঘাত-ব্যবস্থাপনা সেল গঠন করা হবে।
মার্চের শুরুতে ওই সংঘাত লেবাননকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।
সোমবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, যুদ্ধবিরতি সুসংহত করা, ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ করা ও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, যার মধ্যে একটি বিশেষ সেল গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে, তা নিয়ে ভ্যান্স তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর হামলা ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত ইসরাইলি অভিযানে লেবাননে ৪ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লক্ষাধিক মানুষ।