শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র মহাপরিচালক গিলবার্ট হোংবোর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আজ সচিবালয়ে মন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের শ্রম খাতের আধুনিকায়ন, শ্রম আইন সংস্কার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিতকরণে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আইএলও মহাপরিচালককে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, শ্রম খাতের সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এই ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মন্ত্রী গর্বের সাথে উল্লেখ করেন, এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আইএলও-র ১০টি মৌলিক কনভেনশনই অনুসমর্থন করেছে, যা বৈশ্বিক শ্রম পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরকারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর সংশোধন, একটি ত্রিপক্ষীয় ‘ন্যাশনাল সোশ্যাল ডায়ালগ ফোরাম’ গঠন এবং স্বাধীন বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার পাশাপাশি ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় খাতের শ্রমিকদের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলতে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ জাতীয়করণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, দেশে ও বিদেশে দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে, যার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালু করে আত্মকর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। মন্ত্রী বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং কম খরচে কর্মী পাঠাতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান মন্ত্রী।
প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইএলও-র কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। শ্রম পরিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন শ্রম পরিদর্শক নিয়োগসহ আইএলও-র রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন ও মাইলফলকগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে আইএলও-র ধারা ২৬ এর অধীনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য তিনি মহাপরিচালকের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
আইএলও মহাপরিচালক গিলবার্ট হোংবো বাংলাদেশের শ্রম খাতের যুগান্তকারী সংস্কার, বিশেষ করে ১০টি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থন এবং ২০২৬ সালের নতুন শ্রম আইন প্রণয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গতিশীল নেতৃত্ব ও সংস্কারমুখী ভাবধারার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। ইপিজেডসহ সকল কর্মক্ষেত্রে সংগঠনের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখতে, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আইএলও বাংলাদেশের পাশে থাকবে এবং আগামী অক্টোবর মাসের প্রস্তাবিত যৌথ মিশনসহ সার্বিক ক্ষেত্রে নীতিগত ও কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব মোঃ আব্দুর রহমান তরফদার, আইএলও-র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন এবং শ্রম ও কর্মসাংস্থান মন্ত্রণালয় ও আইএলওর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।