ব্যাংককে এশিয়ার অর্থনীতির দিকে বিশেষ নজর 

মো মহসিনঃ

এশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ধারা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায়। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হবে এই সভা।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও থাইল্যান্ডে বসছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। ১৯৯১ সালে প্রথমবার ব্যাংককে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের আয়োজনে এশিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসছে। আইএমএফ বলছে, ব্যাংকককে দ্বিতীয়বারের মতো সভার আয়োজক করা এশিয়ার বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরে।

এশিয়ার অর্থনীতির জন্য বর্তমান সময়টি একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের। অঞ্চলটির অনেক দেশ বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করছে। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক বাধা এবং বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

আইএমএফের জুলাইয়ের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধির ধরন বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন হবে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে কিছু অর্থনীতি বাড়তি সুবিধা পেলেও যুদ্ধের অভিঘাত জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে।

এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার অনেক অর্থনীতি উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এসেছে। পোশাক, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে এশিয়ার দেশগুলোর বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ বৈদেশিক বাণিজ্য, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও আমদানির সঙ্গে যুক্ত। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, জ্বালানি মূল্য এবং বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের এবারের কর্মসূচিতে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৪ অক্টোবর ‘Mobilizing Private Capital for Jobs’ শীর্ষক একটি আয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন। তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমবাজারকে মানিয়ে নেওয়া আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতির বড় অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এ ক্ষেত্রে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি প্রচলিত কাজের ধরন পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘Small AI, Big Jobs’ আয়োজনেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছোট পরিসরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবসা, দক্ষতা, অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশ এবং জনসেবায় ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়টি সামনে রাখা হয়েছে। এই আলোচনায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম অংশ নেবেন।

এশিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—উৎপাদনশীলতা। শুধু কম শ্রম ব্যয়ে উৎপাদন নয়, প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে।

ব্যাংককের সভায় অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। ফলে এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা শুধু সরকারি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিনিয়োগ, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অর্থায়নের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে।

এবারের আয়োজন তাই এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমাবেশ। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো কীভাবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করবে, সেটিই ব্যাংককের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে। আর বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এসব বৈশ্বিক পরিবর্তন থেকে সুযোগ তৈরি এবং ঝুঁকি মোকাবিলার নীতি নির্ধারণই হবে বড় বিষয়।