শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
চীনের সামরিক বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্রমেই বলেছে, ইরানের ভেতরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের গভীর অনুপ্রবেশ বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য একধরনের ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে বিশেষ করে ২০১৫ সালের পর থেকে এবং ২০২৫-২০২৬ সালে গতি পাওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা অভিযান নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের ভেতরে এজেন্ট কাজে লাগানো, সংবেদনশীল ডেটাবেজে অনুপ্রবেশ, রাডার নেটওয়ার্ক অকার্যকর করা এবং সেখান থেকেই নিখুঁত হামলা সমন্বয় করার সক্ষমতাকে চীনা বিশ্লেষকেরা ‘তথ্যভিত্তিক ও বুদ্ধিমান’ যুদ্ধের দিকে রূপান্তর হিসেবে দেখছেন। এই মডেলে সাইবার নাশকতা, অভ্যন্তরীণ এজেন্ট নিয়োগ, প্রযুক্তিগত অনুপ্রবেশ এবং সমন্বিত অভিযান একসঙ্গে কাজ করে। সরাসরি সামরিক হামলার আগে গোয়েন্দা তৎপরতা প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। পরে শুরু হয় গতানুগতিক সামরিক আঘাত। চীনের কাছে এর প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়।
এক বয়ামে দুই বিচ্ছু, নিজেদের রাজনৈতিক ফাঁদে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুএক বয়ামে দুই বিচ্ছু, নিজেদের রাজনৈতিক ফাঁদে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু
যুদ্ধের আগে গোয়েন্দা যুদ্ধ
চীনের নিরাপত্তা আলোচনায় ইরানে ইসরায়েলের অভিযানকে এখন প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বলা হচ্ছে, এখন সামরিক হামলার আগে শুরু হয় গোয়েন্দা যুদ্ধ। চীনা বিমানবাহিনীর সাবেক বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞ ফু ছিয়ানশাও বলেন, ইরানের ভেতরে এজেন্ট বসিয়ে রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করা গোয়েন্দা যুদ্ধের ‘নতুন ধরন।’ ২০২৫ সালের জুনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর হামলার সময় ইসরায়েলি বাহিনীকে ন্যূনতম প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে যে তথ্য উঠে আসে, তা এই মূল্যায়নকে আরও জোরদার করে।
ফু বলেন, এ ধরনের কৌশল প্রচলিত যুদ্ধের ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। বাইরে থেকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার বদলে ভেতর থেকেই তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিমান আকাশসীমায় ঢোকার আগেই প্রতিরোধ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
আরেক চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞ ইয়ান ওয়েই বলেন, ইরানের সংবেদনশীল স্থাপনায় অনুপ্রবেশ শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতা নয়, কাঠামোগত দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। তাঁর মতে, কেবল আইনগত সুরক্ষা বা নিয়মিত নিরাপত্তা প্রটোকল যথেষ্ট নয়। আমলাতান্ত্রিক দুর্বলতা ও ভেতরের প্রবেশপথকে কাজে লাগানো গোয়েন্দা অভিযানের সামনে এগুলো অকার্যকর হতে পারে।
পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক চীনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লি লি বলেন, গবেষণা কেন্দ্র ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরায়েলের সাইবার অভিযান গোয়েন্দা যুদ্ধকে একধরনের শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করতে দেখিয়েছে। প্রচলিত হামলার মতো নয়, এসব অভিযান গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতার সীমারেখা ঝাপসা করে দেয়। ফলে পাল্টা জবাব দেওয়াও জটিল হয়ে পড়ে।
চীনের রেনমিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক তিয়ান ওয়েনলিন সতর্ক করেন, এভাবে ধারাবাহিক গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে তেহরান আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে তার পারমাণবিক সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়াতে পারে।
কাঠামোগত দুর্বলতা ও কৌশলগত শিক্ষ
চীনা বিশ্লেষকেরা বলছেন, মোসাদের অভিযান ইরানের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাকে উন্মোচন করেছে। চীনের সামরিক ও নীতিনির্ধারণী প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব ভাঙনকে ডিজিটাল অবকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ যাচাই প্রক্রিয়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি সামনে আসে। বেইজিংয়ে এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। গোয়েন্দা যুদ্ধ প্রশাসনিক ফাঁকফোকরও ঠিক ততটাই কাজে লাগাতে পারে, যতটা যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্বলতা।
যদি শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান থাকা একটি দেশও এভাবে অনুপ্রবেশের শিকার হয়, তবে একই পদ্ধতি অন্য দেশেও ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডরগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চীনা নীতিনির্ধারণী মহলে মূল শিক্ষা হলো, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। ডিজিটাল যুগে সার্বভৌমত্ব কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে ব্যবস্থার অখণ্ডতার ওপরও।
বেল্ট অ্যান্ড রোডে ইরানের ভূমিকা
চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়া এবং সেখান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সংযোগে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির সমুদ্রপথ চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হলে এসব করিডরে প্রভাব পড়বে। বেইজিংয়ের কাছে এটি শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়; এটি সরাসরি সরবরাহ শৃঙ্খল ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বিনিয়োগ করা অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলবে।
চীনা কর্মকর্তারা তাই ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁরা একতরফা চাপের বিরোধিতা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যুদ্ধে যেভাবে জেতার পরিকল্পনা করছে ইরানযুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যুদ্ধে যেভাবে জেতার পরিকল্পনা করছে ইরান
পাল্টা গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার
২০২৫ সালজুড়ে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের খবর বাড়তে থাকলে বেইজিং তেহরানের সঙ্গে পাল্টা গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার করে। চীনের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা কাঠামোগত প্রভাব বিশ্লেষণ শুরু করে। ইরানের অভিজ্ঞতাকে বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে যৌথভাবে অনুপ্রবেশের পথ, ডিজিটাল দুর্বলতা ও প্রশাসনিক প্রবেশপথ বিশ্লেষণের কাজ বাড়ানো হয় বলে জানা যায়। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পদ্ধতিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের ‘নাইনথ ব্যুরোর’ মাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন গুপ্তচর নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে একটি বিস্তৃত কৌশল বাস্তবায়ন শুরু হয়। চীন ইরানের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করতে পশ্চিমা সফটওয়্যার বাদ দিয়ে সুরক্ষিত ও এনক্রিপ্টেড চীনা সিস্টেম ব্যবহারের আহ্বান জানায়। লক্ষ্য ছিল একধরনের ডিজিটাল ‘মহাপ্রাচীর’ গড়ে তোলা।
উদ্দেশ্য শুধু তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধ নয়। বেল্ট অ্যান্ড রোডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি গোয়েন্দা বিঘ্ন থেকে সুরক্ষিত করাও এর অংশ। চীন তার বাইডুয়ো নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়, যাতে পশ্চিমা জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমে। এতে সিগন্যাল বিঘ্নের ঝুঁকি কমবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়বে। রাডার ব্যবস্থার উন্নয়ন, যেমন ওয়াইএলসি-৮বি প্ল্যাটফর্ম, স্টেলথ বিমান শনাক্তকরণসহ নজরদারি সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে জানানো হয়।
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যেমন এইচকিউ-৯বি, আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও প্রতিরোধ সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও বাড়ানো হয়েছে। চীনা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত মহাকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা আরও বাড়িয়েছে বলে জানা যায়।
দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ের বাইরে গিয়ে বেইজিং ইরানকে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এ লক্ষ্যেই তারা সাংহাই সহযোগিতা-এসসিওর মাধ্যমে কাজ করছে। এসসিওর আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্র হলো এর রিজিওনাল অ্যান্টি-টেররিস্ট স্ট্রাকচার বা র্যাটস। এর সদর দপ্তর উজবেকিস্তানের তাসখন্দে। এই কাঠামো সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা সমন্বয় করে। শুরুতে এটি উগ্রপন্থী হুমকি মোকাবিলার জন্য গড়া হয়েছিল। তবে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তপারের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে তথ্য বিনিময়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেল তৈরি হয়েছে।
চীনা নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণে এখন এসসিওকে শুধু সন্ত্রাসবিরোধী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হয় না। গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ও গোপন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে বেইজিং এই সংগঠনকে গভীর নিরাপত্তা সমন্বয় এবং বাইরের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলার একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরছে। এসসিও প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাকে লক্ষ্য করে কাজ করার ম্যান্ডেট রাখে না। তবে ২০২৩ সালে ইরান পূর্ণ সদস্য হওয়ার পর সহযোগিতার পরিসর বেড়েছে। এর ফলে তেহরান একটি বিস্তৃত ইউরেশীয় নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।
এই কাঠামোর ভেতরে ইরানকে যুক্ত করার পেছনে কার্যকর ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের লক্ষ্য রয়েছে। এতে পাল্টা গোয়েন্দা সচেতনতা বহুপক্ষীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে এটি বার্তা দেয়, তেহরানের ওপর গোয়েন্দা চাপ কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর পরিসরে প্রতিধ্বনিত হয়।
অর্থনৈতিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার
নিরাপত্তা সমন্বয় চীনের কৌশলের একটি স্তর মাত্র। এর আরেকটি বড় স্তর হলো অর্থনৈতিক একীকরণ। চীন এখনো ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ইরান থেকে চীনে রপ্তানি, যার বড় অংশ জ্বালানি, বছরে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্যদিকে চীন থেকে ইরানে আমদানি প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। দুই দেশের ২৫ বছরের সমন্বিত সহযোগিতা চুক্তিতে ইরানের তেল, গ্যাস, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি চীনা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে বেইজিং বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যাতে নিষেধাজ্ঞার চাপ কমানো যায়। তেল রপ্তানির বিনিময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো বিনিময়ভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন নেটওয়ার্ক ও শিল্প স্থাপনা নির্মাণও রয়েছে। এভাবে প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকেও লেনদেন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা কৌশলগত স্থিতিশীলতা জোরদার করে। বাণিজ্যের প্রবাহ ও অবকাঠামোগত অঙ্গীকার রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা চাপের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামাল দিতে একধরনের সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।
কূটনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত সংযম
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে চীন ধারাবাহিকভাবে ইরানের পক্ষে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। তারা সার্বভৌমত্ব, হস্তক্ষেপ নয় এবং একতরফা চাপ প্রয়োগের বিরোধিতার নীতি তুলে ধরেছে। ইরানের স্থাপনায় হামলার সমালোচনাও করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ অস্থিতিশীল হতে পারে—এমন উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
তবে চীনা কর্মকর্তারা এমন ভাষা ব্যবহার এড়িয়ে চলেন, যা ইরানকে সরাসরি সামরিক প্রতিরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার বোঝায়। এই অবস্থান সচেতনভাবে নেওয়া। চীন প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, প্রযুক্তিগত বিকল্প তৈরি করে, অর্থনৈতিক একীকরণ গভীর করে এবং কূটনৈতিক সমর্থন জোরদার করে। কিন্তু একই সঙ্গে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। কৌশলগত সতর্কতা বেইজিংয়ের হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রেই থাকে।
হাইব্রিড সংঘাতের প্রেক্ষাপটে স্তরভিত্তিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের ভেতরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতাকে চীনা বিশ্লেষণে আধুনিক সংঘাতের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। গোয়েন্দা যুদ্ধ এখন সাইবার প্রবেশ, মানব নেটওয়ার্ক, প্রশাসনিক অনুপ্রবেশ এবং নির্ভুল হামলার সক্ষমতাকে একত্র করে। প্রচলিত সামরিক উত্তেজনা প্রকাশ্যে দেখা দেওয়ার আগেই এটি কৌশলগত পরিবেশ বদলে দেয়। বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়াও এই মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডিজিটাল সুরক্ষা, বিকল্প নেভিগেশন ব্যবস্থা, রাডার আধুনিকীকরণ, স্যাটেলাইট–সমর্থিত নজরদারি, এসসিওর মাধ্যমে বহুপক্ষীয় সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে একটি স্তরভিত্তিক পাল্টা কৌশল গড়ে তোলা হয়েছে।
এই কাঠামোয় প্রতিশোধের চেয়ে স্থিতিস্থাপকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য হলো উত্তেজনা বাড়ানো নয়, বরং ব্যবস্থা ও কাঠামোকে আরও শক্ত করা। সুতরাং ইরানে চীনের সম্পৃক্ততার দ্বৈত গুরুত্ব রয়েছে। একদিকে এটি টেকসই গোয়েন্দা চাপের মুখে থাকা একটি কৌশলগত অংশীদারকে শক্তিশালী করে। অন্যদিকে এটি বেইজিংকে নিজস্বভাবে হাইব্রিড সংঘাত ও কাঠামোগত দুর্বলতা সম্পর্কে আরও গভীর বোঝাপড়া তৈরি করতে সহায়তা করে।
এই প্রতিযোগিতা কাঠামোগত। এখানে সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নয়; বরং শক্ত অবকাঠামো, নিরাপদ নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল। নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা এবং ভারসাম্য রক্ষা—এই তিনটি উপাদানই বেইজিংয়ের কৌশলকে সংজ্ঞায়িত করে। লক্ষ্য হলো গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ সীমিত রাখা; একই সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত ভারসাম্য অটুট রাখা।
-আজকের পত্রিকা