মানুষ ইসরায়েলকে পছন্দ করুক বা না করুক, তেল আবিব ওয়াশিংটনের ‘পরম মিত্র’।

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে যখন সমালোচনা চলছে, তখন দুই দেশের সম্পর্ককে অকৃত্রিম বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তেল আবিব ওয়াশিংটনের ‘পরম মিত্র’।
হঠাৎ করে ট্রাম্পের কেন ইসরায়েলকে পরম মিত্র হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন হলো? সে উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একজন ব্যক্তি সামনে এসেছেন- বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যিনি ঘরে ও বাইরে ‘বিপর্যয়ের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
ঘরে অস্থিরতার সবশেষ উদাহরণ শনিবার রাতের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবিতে তেল আবিবে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। এই বিক্ষোভ শুরুর প্রায় কাছাকাছি সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লিখেন, ‘মানুষ ইসরায়েলকে পছন্দ করুক বা না করুক, যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র হিসেবে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে। কঠিন সময়ে অন্যরা তাদের আসল চেহারা দেখিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল তেমন নয়। তারা সাহসী, নির্ভীক, অনুগত ও বুদ্ধিমান। তারা কঠোরভাবে লড়াই এবং কীভাবে জয়ী হতে হয় সেটিও জানে।’

প্রথম বিপর্যয়
ট্রাম্পের এই পোস্টে একটি বাক্য তাৎপর্যপূর্ণ- ‘কীভাবে জয়ী হতে হয়, ইসরায়েল সেটি জানে।’ এই কথাটির আড়ালে লুকিয়ে আছে নেতানিয়াহুর প্রথম ‘বিপর্যস্ত’ অবস্থা। সাধারণত, যখন কোথাও হেরে যাওয়ার শঙ্কা বা লক্ষণ থাকে, তখনই জয়ী হতে চাওয়ার কথা বলা হয়।
ইরান যুদ্ধে নেতানিয়াহুর বিপর্যয় ঘটার প্রসঙ্গটি উঠছে গত ৮ এপ্রিল থেকে। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সেদিন অস্ত্রবিরতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন। এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিপর্যয়।’
ইরানকে এতদিন ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে প্রচার করেছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন করার ব্যাপারে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে। তবে যুদ্ধবিরতির পরদিনই দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান যুদ্ধে নেতানিয়াহুর লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন হয়নি। ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো ইসরায়েলের অন্যতম হুমকি হিসেবে টিকে আছে।
চলতি বছর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে যুদ্ধের ফলাফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শনিবারের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নেতানিয়াহুর ঘরের বিপর্যয়কে আবারও সামনে আনছে। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী- বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করছেন। তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও ফাটল ধরাচ্ছেন।

দ্বিতীয় বিপর্যয়
তেল আবিবের বিক্ষোভের দিনই আরেকটি ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে। সেখানে তহবিল সংগ্রহের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। কয়েক’শ মার্কিনীর সামনে তিনি নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন। বলেন, ‘নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন।’
ট্রাম্পকে অর্থ্যাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে নেতানিয়াহু যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন- এমন বক্তব্যের মাধ্যমে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে কি মার্কিনীদের বিপদের কারণ হিসেবে তুলে ধরলেন হ্যারিস? ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ছে। গত তিন বছরের রেকর্ড ভেঙে প্রতি গ্যালনের দাম সম্প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরবর্তী নির্বাচনের (২০২৮) সম্ভাব্য একজন প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করলেন। যা ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনীদের নিম্নমুখী জনমতের গতি বাড়াতে আরেকটি জ্বালানি হিসেবে কাজ করতে পারে।
গত ৭ এপ্রিল প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্ক ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করছেন। গত বছর এটি ৫৩ শতাংশ ছিল। গত ২৩-২৯ মার্চ চালানো জরিপে সাড়ে তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তে তাদের আস্থা নেই। গত বছর এই চিত্র ছিল ৫২ শতাংশ।

ট্রাম্পের সহানুভূতি এখন কেন
ইসরায়েলি গণমাধ্যম হারেৎজের সাংবাদিক আমোস হারেল রোববার লিখেছেন, নেতানিয়াহু টানা দ্বিতীয়বারের মতো এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। জনগণ এখন তাঁর কাছে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন সংক্রান্ত ব্যাখ্যা চাইছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন এখনো পরম বন্ধু সে ব্যাখ্যাও দাবি করছে।
এ অবস্থায় ইসরায়েলকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন জানানোর একটি সম্ভাব্য কারণ বের করার চেষ্টা করেছেন আলজাজিরার সাংবাদিক টনি চেং। তাঁর মতে, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি জনমত প্রভাবিত করতে ট্রাম্প সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
শনিবার রাতের পর রোববার লেবানন সীমান্তবর্তী এলাকায়ও বিক্ষোভ হওয়ার কথা। ইরানের পর লেবাননের সঙ্গেও ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে প্রভাব রেখেছেন ট্রাম্প। ১০ দিনের এই যুদ্ধবিরতির আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তিনি নেতানিয়াহু প্রশাসনকে বোমা বর্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। টনি চেং লিখেছেন, মূলত এরপরই সার্বিকভাবে মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে, অস্ত্রবিরতির কারণেই যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মানুষের এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাম্প সম্ভবত ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন বলে মত টনির। তিনি আরও লিখেছেন, ইসরায়েল অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। তাই তাদের প্রতি সমর্থন জানানোকে প্রয়োজন বলে মনে করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।  -বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *