শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
রণক্ষেত্রের বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে এখন কূটনীতির অন্দরে চড়া সুর। পশ্চিম এশিয়া যখন এক ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে উন্মোচন করলেন যুদ্ধের নেপথ্যের আসল ছক। তার কথায় ফুটে উঠল এক নাটকীয় সত্য- এই লড়াই কেবল সীমানার নয়, এ লড়াই ইরানের অস্তিত্ব মুছে দেয়ার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু গল্পের শুরুটা যে লক্ষ্য নিয়ে হয়েছিল, শেষটা যে তেমন হবে না, লারিজানি আজ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
যুদ্ধের প্রথম আট দিনের খতিয়ান দিতে গিয়ে ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজের রাজনৈতিক প্রতিবেদকদের মুখোমুখি হয়ে লারিজানি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে আয়নাটা একটু বড় করতে হবে। শত্রুর আসল লক্ষ্য কেবল সীমান্তে আঘাত হানা নয়, বরং ইরানকে টুকরো টুকরো করে ফেলা। ডোনাল্ড ট্রাম্প আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন দম্ভ করে হুঙ্কার ছাড়ছেন, তখন তাদের পেছনের আসল কারিগর হলো জায়নিস্ট বা ইহুদিবাদীরা। তাদের কাছে ইরানের মতো বিশাল একটি দেশের টিকে থাকাটাই বড় মাথাব্যথার কারণ। তাই তারা চেয়েছিল এক ধাক্কায় ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে।
গল্পের নাটকীয় মোড় আসে যখন লারিজানি উল্লেখ করেন সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা। শত্রুরা তাদের আক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যখন রাহবার আয়াতুল্লহিল উজমা খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং তাদের সন্তানদের শাহাদাত বরণ করতে হয়।
লারিজানি বলেন, ওই সময় গোটা দেশে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। কিন্তু সেই শোকই জন্ম দেয় এক মহাকাব্যিক বীরত্বের। শত্রুরা ভেবেছিল এই শোক আর শোকের অভিঘাত ইরানকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলবে, কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল ইরানের মাটির টান।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক টুইটের কথা উল্লেখ করে লারিজানি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেন, ট্রাম্প আজ দাবি করেছেন ইরান নাকি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই একটা টুইটই প্রমাণ করে তাদের মজ্জাগত ইচ্ছেটা কী ছিল। কিন্তু আমেরিকানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা পশ্চিম এশিয়া আর বিশেষ করে ইরানকে চিনতেই পারেনি। তারা ভেবেছিল ভেনিজুয়েলায় যে ফর্মুলা কাজে লেগেছে, এখানেও তাই ঘটবে। কিন্তু ইরান কোনো সাধারণ দেশ নয়; এখানে আশুরার সংস্কৃতি আর ইমাম হোসেনের বীরত্ব মানুষের রক্তে মিশে আছে। শোক যেখানে শক্তিতে পরিণত হয়, সেখানে কোনো আগ্রাসনই ধোপে টেকে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ছকটা ছিল সস্তা চলচিত্রের মতো, প্রথমে আকাশছোঁয়া হামলা চালিয়ে ইরানের শাসন কাঠামোকে ধসিয়ে দেয়া, নেতৃত্বকে হত্যা করা এবং মুহূর্তের মধ্যে এক বিধ্বংসী যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া। তারা ভেবেছিল এক আঘাতেই কেল্লা ফতে। কিন্তু বাস্তবে তারা এখন এই যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে গেছে। তারা আশায় ছিল মানুষ না খেয়ে মরবে, জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে আর রাস্তায় হাহাকার শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে কী হলো? যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে মানুষের যাতায়াত বাড়লেও সরকার আর মন্ত্রীরা দিনরাত কাজ করে জ্বালানি আর নিত্যপণ্যের জোগান নিশ্চিত করেছেন। কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি।
আরো মজার ব্যাপার হলো লারিজানি যখন আমেরিকানদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কথা তুললেন। শত্রুরা গুজব ছড়িয়েছিল যে ইরানের সামরিক কমান্ডাররা নাকি শত্রুপক্ষে যোগ দিতে তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। লারিজানি সাফ জানিয়ে দিলেন, এগুলো সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা সস্তা চাল। বাস্তবে ইরানি সেনারা বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি কুর্দি জনপদগুলোকে উস্কানি দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ তৈরির যে চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, তাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। কুর্দিরা জানে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কী সর্বনাশ করেছে, তাই তারা এই ফাঁদে পা দেয়নি।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো ট্রাম্পের সেই স্বীকারোক্তি। তিনি নাকি কারো কারো দেয়া তথ্যে ‘প্রলুব্ধ’ হয়ে এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
লারিজানি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, একটি বড় দেশের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মতো জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নেন ‘প্রলোভনে’ পড়ে? এর ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। মার্কিন সেনারা এখন এই অঞ্চলে প্রাণ হারাচ্ছে, তাদের নিজেদের মধ্যেই সমন্বয়হীনতা চরমে। যারা ইরানকে ভাঙতে চেয়েছিল, আজ তারা নিজেরাই নিজেদের সম্মান নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে।
লারিজানি পুরনো স্মৃতি হাতড়ে ওমানের মরহুম সুলতান কাবুসের এক গোপন কথা শোনালেন। ইরাক যখন ইরান আক্রমণ করতে চেয়েছিল, জর্ডানের রাজা সুলতান কাবুসকে আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিতে বলেছিলেন। কিন্তু ওমান তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ইতিহাসের সেই শিক্ষা আজ আবারো প্রাসঙ্গিক। ইরান প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু লারিজানির হুঁশিয়ারি একদম পরিষ্কার- যদি কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে দেয়, তবে ইরান পাল্টা জবাব দিতে এক সেকেন্ডও দেরি করবে না। এটি ইরানের আইনগত অধিকার।
গল্পের শুরু হয়েছিল ধ্বংসের আশঙ্কা নিয়ে, আর শেষটা হলো প্রতিরোধের অটল দৃঢ়তায়। লারিজানি স্পষ্ট করে দিলেন, স্কুলে বা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে কিংবা নেতাদের শহীদ করে ইরানকে নতজানু করা যাবে না। আজ রাস্তাঘাটে মানুষের চোখেমুখে যে আত্মমর্যাদা আর ঐক্য দেখা যাচ্ছে, সেটাই বলে দিচ্ছে যে ট্রাম্পের সেই বিভাজনের স্বপ্ন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইরান আজ আগের চেয়েও বেশি ঐক্যবদ্ধ, আর শত্রুরা তাদের নিজেদের ছকের জালেই বন্দী।