শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
“আমি অলরেডি বলেছি, একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। সরকারের, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেটার একটা ইমিডিয়েট রিয়্যাকশন, একটা পদক্ষেপ আমি নিয়েছি। পরবর্তীতে আমরা কী করবো সেটা আমি এখনই বলছি না”।
ভারতের রাজধানী দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসার বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে এই কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
একটি সম্মেলনে যোগ দিতে রোববার দিল্লিতে গেলেও ইমিগ্রেশনের বাধার মুখে পড়েন জাহেদ উর রহমান।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয় উপদেষ্টা এবং তার পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর সমান।
দিল্লি বিমানবন্দরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাকে বসে থাকতে হয়। যদিও বাংলাদেশ হাইকমিশনসহ নানা পক্ষের তৎপরতায় তাকে শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে পর শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
রাতে শ্রীলঙ্কার কলম্বো যান এবং সোমবার দুপুর নাগাদ ঢাকায় পৌঁছান।
পরে ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে ডেকে ঢাকার প্রতিবাদপত্র তার হাতে তুলে দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে একটি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান দিল্লির ঘটনার ব্যাখ্যা দেন।

কী ঘটেছিলো?
জাহেদ উর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মিডিয়াতে যা যা এসেছে, ঘটনাগুলো এরকমই ঘটেছে। আমি ওখানে একজন ব্যক্তি হিসেবে যাইনি। গেছি সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে, রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে। ফলে আমার সাথে যা হয়েছে, আমার কাছে মনে হলো যে আমাদের ইন্সট্যান্ট একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সে কারণেই আমি ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি”।
দিল্লি থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত এই সিদ্ধান্ত তার একার ছিল, নাকি সরকারের ছিল- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত আমার ছিল। কারণ পরিস্থিতি আমি দেখেছি। পরে আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ “একটা পর্যায়ে খুবই চেষ্টা করেছে” যেন তিনি ভারতে প্রবেশ করেন এবং নিয়মিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেন বলেন জানান জাহেদ উর রহমান।
“কিন্তু আমি আর সেটা করিনি। কারণ আমার মনে হয়েছে, আমি ব্যক্তি হিসেবে মনে করেছি তা না। এই সরকারের, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা হিসেবে আমি মনে করেছি। তখন মনে হয়েছে, রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিগনেচার থাকা দরকার। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমার কখনো এই উদ্দেশ্য নেই যে এটার মাধ্যমে পাল্টাপাল্টিভাবে কোনো নেগেটিভ পরিস্থিতি তৈরি হোক। আমার মনে হয়েছে, একটা মেসেজ এই দেশ ও এই দেশের বাইরে যাওয়া দরকার। সেটা হল, এটা শেখ হাসিনা সরকার না,” বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, জাহেদ উর রহমানের এই ঘটনায় সোমবারই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
“এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। দুঃখজনকও বটে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে,” সাংবাদিকদের বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, “ঘটনাটি অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো নয়। এ ঘরনের ঘটনা আমরা প্রত্যাশা করি না”।
এদিকে, বাংলাদেশের সরকার বা অন্য দলের যে কারও সঙ্গে তার মতো এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারতো বলেও মন্তব্য করেছেন জাহেদ উর রহমান।
“ভারত নয় শুধু, ভবিষ্যতে অন্য যে কোনো দেশের সাথে এঙ্গেজমেন্টে আমাদের একটা সুস্পষ্ট নীতি আছে। কোনোভাবেই আমরা চাই না, কোনো দেশের সাথে খারাপ কোনো পরিস্থিতি হোক, শত্রুতা তো দূরেই থাকুক। সবার আগে বাংলাদেশ, আমরা বাংলাদেশকে রাখবো, তার মাধ্যমে প্রত্যেকটা দেশের সাথে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এঙ্গেজমেন্ট হবে। সেটা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা, আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে বা আমার ক্ষতি করে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া, এই নীতিতে কোনো দেশের সাথেই এই সরকার যাবে না”।
বিষয়টি ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চলে গেছে এবং তারা যা যা করণীয় তা করছে বলেও তিনি জানান।
জাহেদ উর রহমান বলেন, “যখন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে কথা বলতাম, তখন আমি একটা কথা খুব বলতাম। যে, আমরা যেহেতু শক্তিতে-সাইজে তুলনামূলকভাবে ছোট দেশ। বন্ধু পাল্টানো যায়, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। এটা সত্য কথা। এই কথাটা ভারতের ক্ষেত্রেও সত্য। তারা চাইলেই আমাদেরকে পাল্টাতে পারছেন না। আমরা তার প্রতিবেশী হিসেবে থেকেই যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, তাদের সরকার এটা বুঝবেন যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে”।
জাহেদ উর রহমান কূটনৈতিক পাসপোর্ট না নিয়ে ব্যক্তিগত পাসপোর্টে দিল্লি কেন গিয়েছিলেন, সেটাও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
“কূটনৈতিক পাসপোর্ট আমি নেইনি। অন্য কোনো কারণে না। এই নিচ্ছি, নিবো নিবো করতে করতে (দেরি) হয়েছে। তবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনো কারণ না। কারণ আমার পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার দেওয়া রয়েছে। তার মানে কূটনৈতিক পাসপোর্ট যেভাবে কাজ করে, এটা সেভাবেই ইফেক্টিভ হওয়ার কথা। আমি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিতে বাধ্যও না। আমি নিতে পারি চাইলে। এখানে অন্য কারণ ছিল, যা ইন্ডিয়ান মিডিয়াতেও কম-বেশি এসেছে”।
বিমানবন্দরে কী হয়েছিল তার বর্ণনা করেন তিনি:-
“আমি একটা ডেলিগেটকে লিড করছি, আমার সাথে অন্য মানুষজন ছিলেন। তারা ইমেগ্রেশন পার করে চলে গেলেন। আমার ইমিগ্রেশন যখন শুরু হলো, আমি মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম যে তারা দেরি করছেন। নানান জনের সাথে কথা বলছেন। তাদের সময় লাগছে”।
বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাকে বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নাই, আমাকে একটা জায়গায় বসতে দেওয়া হয়েছে। সেই বসতে দেওয়াটাও এই রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে মনে করি, নট স্যুইট্যাবল ফর মি। আমি বসে ছিলাম মূলত, আমায় খুব বেশি কিছু জানানোও হচ্ছিলো না”।
দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাই কমিশনার পুরো সময়টা পাশে ছিলেন জানিয়ে মি. রহমান বলেন, “তিনি তার জায়গা থেকে সলভ করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে”।
“হাই কমিশনার সম্পর্কে বলা হয় যে তার দুর্বলতা বা গাফিলতি ছিল কি না। কিন্তু আমি ওখানে ল্যান্ড করার পর থেকে আমাদের হাই কমিশনার প্রথম থেকে আমার সাথে ছিলেন। শেষে আমি ইন্ডিয়ান টাইম রাত সাড়ে ১২টায় কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরেছি। কারণ আমি চাইনি ভারতের ইমিগ্রেশন ক্রস করবো। সেজন্য আমারও বেশ কিছু ঝুটঝামেলা হয়েছে।”
“প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু কলম্বোর ফ্লাইটে তুলে দিয়ে হাইকমিশনার বাড়িতে গেছেন। শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনারও এয়ারপোর্টে প্রেজেন্ট ছিলেন। আমি চাইনি ইমিগ্রেশনের সিলটা নিতে। যে আমি ওখানে প্রবেশ করি নাই। এ কারণে ফেরাটা জটিল হয়েছে। নইলে সহজ হতে পারতো।
কেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের আচরণ করলো- সে বিষয়ে তিনি বলেন, “সমস্যা কী হয়েছে, তা আমি নিজের মুখে বলছি না। কারণ এটা ইন্ডিয়ান মিডিয়ায় যথেষ্ট এসেছে। তারা তাদের সোর্স থেকে খবর-টবর নিয়েছে। কিন্তু দুই ঘণ্টার মাথায় আমি ডিসাইড করেছি যে ইট’স টু মাচ, আমি আর ঢুকবো না। এই রাষ্ট্রের একটা পদে আছি, সেই পদের প্রতি যে একটা সৌজন্য, তা ল্যাক করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত”।
“যখন আমি পাসপোর্ট ফেরত চাইলাম, তখন তাদের দিক থেকে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণভাবে অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমার মনে হলো, যা হয়েছে তার একটা প্রতিবাদ রাখা দরকার আছে”।
তার ভারতে যাওয়ার তথ্য আগেই জানানো হয়েছিল বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
“আমি যে ওখানে যাবো, এই তথ্য জানানো হয়েছিলো, আমাকে নিয়ে সমস্যা থাকলে সেই সমস্যার সমাধান করা বা অবজেকশন আগে দেওয়া, এরকম হলেই হয়তো হতো”।
ভবিষ্যতে ভারতে যাওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, “যদি প্রোপার ইনভাইটেশন পাই, আমি নিশ্চয়ই ভারতে যাবো”।
“আমি ভারতের সাথে এঙ্গেজ করতে চাই, লজিক্যালি ও র্যাশনালি। ভারতের সাথে এঙ্গেজ করার কথা বললে কারও কারও মনে হয়, আমি দেশ বিকিয়ে দিচ্ছি। বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক এই সরকার এঙ্গেজ করবে না। সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যসহ অনেককিছুতে উন্নতি করতে চাই, সেই সুযোগ আছে”।
ভারতের সাথে সম্পর্ক যে জায়গায় ছিল, সেখান থেকে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ইন্টেরিমের সময় সম্পর্ক অনেকটা খারাপ পর্যায়ে গেছে। সেগুলো সরিয়ে রেখে আমরা এঙ্গেজ করতে চাই, ব্যবসা বাণিজ্য করতে চাই। এক্সচেঞ্জ নানা ফর্মে হতে পারে। গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের ডিসেম্বরে, সেই চুক্তি রিনিউয়াল নিয়ে কথা আছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে কথা আছে, আমাদের অভিন্ন আরও ৫৩টা নদী আছে। সুতরাং, আমাদের রাইট আছে, আমাদের ভারতের সাথে এঙ্গেজ করতে হবে। তাই, এখানে কোনোভাবে যদি রোল প্লে করতে পারি, আমি তা লুফে নেবো”।
এই ঘটনায় ভারত কোনো প্রতিক্রিয়া দিয়েছে কি না- এ প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, “পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানে”। -বিবিসি বাংলা