দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টারঃ

দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার পর বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গত সোমবার চীনের ডালিয়ানে পৌঁছার পর থেকেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত এই চার দিনের সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।বাংলাদেশ সংবাদ
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে মূলত যে সমস্ত বিষয় এবং এজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে- চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি।
সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এটি আগামীকাল ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হবে। যেটিকে পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ সবসময় একটি সংবেদনশীল অবস্থানে থাকে। সাধারণত বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের প্রথম সফর নয়াদিল্লি বা বেইজিং দিয়ে শুরু হওয়ার একটি প্রথাগত রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে এবং তার পরপরই চীন সফরে গিয়ে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক চাল চেলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির পক্ষ না নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ও ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র বার্তা দিলেন।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ অবকাঠামো সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেন। বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানান। আর দ্বিপাক্ষিক মূল বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার। আজ ২৫ জুন তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং চীনের প্রিমিয়ার (প্রধানমন্ত্রী) লি কিয়াং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক। এটি আগামীকাল ২৬ জুন অনুষ্ঠিত হবে।বাংলাদেশ সংবাদ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরে প্রায় ১৫টির মতো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এই সফরে মূলত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রিন এনার্জি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়গুলোই টেবিলের মূল আলোচনায় থাকবে। এছাড়া তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।
বেইজিংয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের রাজধানী বেইজিং পৌঁছেছেন। গতকাল বুধবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ডালিয়ান থেকে হাই-স্পিড (বুলেট) ট্রেনে করে বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিং পৌঁছান। হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী (জেনারেল এডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস) সান মেইজুন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান লালগালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে চীনের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী এই সফরের সময়ে বেইজিংয়ে ‘দিয়াওইতই’ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন।
দুপুরে দালিয়ান রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাইস্পিড ট্রেন (বুলেট ট্রেন) চড়ে বেইজিং আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমানসহ তার সফরসঙ্গীরা।
প্রসঙ্গত, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াং এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চার দিনের সফরে প্রথমে গত সোমবার রাতে দালিয়ান আসেন। সোমবার তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াং।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। চীনের ডালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নসের এই আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু উরি বাহ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলঝাস বেকতেনভ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন সেওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম ওসর উচরাল এবং মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোইকো স্পাইজিচ অংশ নেন। সম্মেলনটিতে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম অঙ্গনের ১,৭০০ জনেরও অধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোসে’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সেরা অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে।
শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মূল আকর্ষণ হচ্ছে- তিনি বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে আগামীকাল একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আয়োজিত এই সফরে দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এরপর ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনসিসি) চেয়ারম্যান ঝাও লেজি-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের শীর্ষ আইনপ্রণেতার সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ। তবে দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় **মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহল এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের সফরের অন্যতম মূল এজেন্ডা হলো চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশে নিয়ে আসা। তবে ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি তথা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনের উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ আই) এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ চুক্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল ইনপুটের একটি বড় অংশ চীন থেকে আসে। এই খাতে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অধীনে বাংলাদেশে চলমান ও নতুন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার বা উন্নয়নকারী হিসেবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নিয়োগ দিয়ে সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি একটি পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটিতে (ফ্রি ট্রেড জোন) চীনা বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করবে। এর পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাব অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়নের পর চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা স্টেক থাকবে, আর বাকি ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে চীনের কাছে।
অংশীদারিত্বের (ইক্যুইটি) এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে ইআরডি উল্লেখ করেছে যে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা বন্টনে জাপানকে ৭৬ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ২৪ শতাংশ ইক্যুইটি দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের কৌশলগত আর্থিক স্বার্থহানী হয়েছে। সফরকালে চীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ(জিডিআই), ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘পান্ডা বন্ড’ চালুর একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।
চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করা, কারেন্সি সোয়াপ (মুদ্রা অদল-বদল) চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়ন বা আপগ্রেড করা এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন বৈশ্বিক নেতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে চায়, তাই সরকার বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এই দুটি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপকভাবে কর ছাড়ের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যান খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর হবে। দুই দেশ যৌথভাবে সবুজ জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানের ওপর গবেষণাও করবে।’
নীলফামারীতে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ‘মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। জানা গেছে, আগের আওয়ামী সরকারের সময় এই প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আরো এগোয়নি বলে জানা গেছে।
সরকার তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে, যেগুলোতে চীনের অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে বেইজিংয়ে তার প্রতিনিধিদলে যুক্ত রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, শিক্ষা উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা। চীনের পক্ষেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এসব দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য তৈরি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে এই সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে একটি নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক: এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। গতকাল বুধবার চীনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এর সাইডলাইনে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজাখস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন। এ ছাড়া রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা। কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে বাংলাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে জানান। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *