মোঃ নূরুল ইসলাম সবুজ গাজীপুর প্রতিনিধিঃ
গাজীপুরে শব্দদূষণ কমাতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখন থেকে জেলার সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি কাজে ব্যবহৃত যানবাহন অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার না করে চলাচল করবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
বুধবার গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
সূচনার বক্তব্যে জেলা প্রশাসক শব্দদূষণ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জানান, “সবার আগে বাংলাদেশ” গড়ার লক্ষ্য অর্জনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরিকল্পনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য—জেলার সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা।
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহরিয়ার নজিরের সঞ্চালনায় সভায় শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রচলিত আইনের বিধান নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ও প্রাসঙ্গিক ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে শব্দদূষণ মুক্ত গাজীপুর গড়ার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকের এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তা বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
জেলা প্রশাসক তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, হর্ন না বাজিয়ে নিরাপদে গাড়ি চালানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে তিনি নিজেই তাঁর সরকারি গাড়ি নিয়ে গাজীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও ঢাকায় টানা ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। এতে যাত্রাপথে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।
উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরাও জেলা প্রশাসনের এই কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানান এবং বাস্তবায়নের সুবিধার্থে বিভিন্ন গঠনমূলক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।
আলোচনার একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “হিসাব অনুযায়ী গাজীপুর জেলায় প্রায় দুই হাজার সরকারি গাড়ি রয়েছে, যা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।”
এরপর তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আমার গাড়িতে আর অযথা হর্ন বাজাব না। আপনারা কি নিজ নিজ গাড়ির ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকার করতে প্রস্তুত?” জেলা প্রশাসকের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত সব কর্মকর্তা সমস্বরে সমর্থন জানান এবং জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া অধীনস্থ সব সরকারি যানবাহনে হর্ন না বাজানোর একনিষ্ঠ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।Government
কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, অত্যন্ত জরুরি মুহূর্তে কখন ও কোথায় হর্ন ব্যবহার করা যাবে, তার একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে দ্রুতই সব দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের মতে, অহেতুক হর্ন বাজানোর ফলে প্রতিদিন শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, রোগী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ নাগরিকেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই সর্বসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরিতে সরকারি যানবাহন থেকেই উদাহরণ সৃষ্টির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরকারি ও আধাসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধান প্রধান সড়ক ও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় বাস, লেগুনা, সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে পুরো গাজীপুর নগরীকে হর্নমুক্ত করার লক্ষ্যে সতর্কতামূলক বার্তা ও সচেতনতা প্রদান করা হয়।
প্রথম ধাপে গাজীপুরের সরকারি গাড়িগুলোকে হর্নমুক্ত রাখার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা হলো। পর্যায়ক্রমে জেলার প্রতিটি যানবাহনকে এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
১. দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা
প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগ: সরকারি যানবাহনে ‘নো হর্ন’ কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে জেলা প্রশাসন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সকল সরকারি যানবাহনে দৃশ্যমান স্থানে ‘সাইলেন্ট ড্রাইভিং’ স্টিকার সংযোজন করা হবে।
চালকদের প্রতিশ্রুতি: সরকারি দপ্তরের চালকদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল গাড়ি চালনার অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করা হবে।Government
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান: বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকাগুলোকে কার্যকরভাবে ‘সাইলেন্ট জোন’ বা ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে নিশ্চিত করা হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
২. শিল্প খাত ও গণপরিবহনে সচেতনতা বৃদ্ধি
শিল্প প্রতিষ্ঠান: শিল্পাঞ্চলের পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব ও ভাড়াকৃত যানবাহনে হর্ন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হবে।
গণপরিবহন ও রাইড শেয়ারিং: মোটরসাইকেল চালকদের দায়িত্বশীল করতে ‘স্মার্ট রাইডার’ শীর্ষক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। এছাড়া গণপরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের সমন্বয়ে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ সভার আয়োজন করা হবে।
৩. আইন প্রয়োগ ও নিয়মিত তদারকি
উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণ: সিএনজি, অটোরিকশাসহ সকল প্রকার যানবাহন থেকে হাইড্রোলিক ও অননুমোদিত উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
মোবাইল কোর্ট ও নজরদারি: নীরব এলাকাগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পথসভা ও সামাজিক প্রচার: প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের লিখিত প্রতিশ্রুতি গ্রহণের পাশাপাশি শব্দদূষণবিরোধী ব্যাপক গণসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ৭০ ডেসিবেলের অধিক শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতিসাধন করতে পারে। উচ্চশব্দ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, মানসিক অস্থিরতা এবং শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জেলা প্রশাসন এই বিশেষ শব্দদূষণ বিরোধী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।