সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ‘সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব’ শীর্ষক আলোচনা সভা আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “আমার সংস্কৃতি, আমার পরিচয়।” একটি জাতির সংস্কৃতি তার আত্মপরিচয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু সংস্কৃতিচর্চার বিষয় নয়; এটি জাতীয় আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনগণ যেমন প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তেমনি একটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও জীবনাচার ধারণ ও বিকাশের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের চিত্রশিল্প, সংগীত, নাটক, নৃত্য, লোকসংস্কৃতিসহ শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার বিকাশ, সংরক্ষণ ও প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি নয়। বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এ দেশের ৫০টিরও বেশি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি লালন করে আসছে। পাহাড় ও সমতলের মানুষের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে করেছে অনন্য ও সমৃদ্ধ।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, পথ ও মতের ভিন্নতা থাকলেও আমরা সবাই বাংলাদেশি। আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেই রয়েছে ঐক্যের শক্তি। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই চেতনার সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এই নবযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মন্ত্রী বলেন, “একটি দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে সেই দেশের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।” অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রে যে ক্ষয় ও বিপর্যয় ঘটেছে, তা কাটিয়ে একটি সমৃদ্ধ, আত্মমর্যাদাশীল ও সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের কল্যাণে দেশ পুনর্গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত ও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে। ফলে আজকের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলা এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুস্থ, সৃজনশীল ও দেশজ সংস্কৃতিচর্চাকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা ছড়িয়ে দিতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রা, বাউল উৎসব, লালন উৎসবসহ লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আয়োজন আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন ও আত্মপ্রত্যয়ী প্রজন্ম গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এই নবযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধ এবং সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, “গণমাধ্যম হচ্ছে জাতির দর্পণ।” একটি দেশের মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বায়নের এই যুগে অপতথ্য, বিকৃত তথ্য ও অসত্য সংবাদ প্রচার ও প্রসার থেকে গণমাধ্যমকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তাদের প্রত্যাশা, চাওয়া-পাওয়া ও সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে শিক্ষা, তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তরুণদের জন্য জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বিত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সময় টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল ও ‘পরিচয়’-এর আহ্বায়ক জোবায়ের বাবু।

আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাসাসের সভাপতি ও চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ড. আব্দুল হাই সিদ্দিক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার এবং বাউল সাধক শফি মন্ডল।
আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, অপতথ্য ও অপসংস্কৃতির বিস্তার রোধ, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে টক শোর আয়োজন করা হয়। এতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।