আবুল বাশার মিরাজ
নদী আমাদের সভ্যতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। “নদীমাতৃক বাংলাদেশ” নামটি কেবল কাব্যিক নয়, বাস্তবেরও প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই নদীগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। একদিকে দখল, অন্যদিকে দূষণ-দুইয়ের চাপে একের পর এক নদী হারাচ্ছে তাদের প্রাণ। রাজধানী ঢাকার পাশের ঐতিহ্যবাহী নদী শীতলক্ষ্যা তার করুণতম উদাহরণ। একসময় এই নদীই ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌপরিবহন ও জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু আজ এটি দখল, বর্জ্য ও অব্যবস্থাপনার চাপে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বর্তমানে অসংখ্য শিল্প-কারখানা, ডাইং, ইটভাটা, গুদাম ও বসতি গড়ে উঠেছে। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ রোধ করে নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে নদীর দুই তীর ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক শিল্পমালিক নদীর ভেতর পর্যন্ত মাটি ফেলে জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সাইনবোর্ড, কাচপুর, গোদনাইল ও বন্দর এলাকায় নদীর তীর প্রায় পুরোপুরি বাণিজ্যিক দখলে চলে গেছে। একসময় এই নদীপথে বড় বড় নৌযান চলাচল করত, নাব্যতা ছিল পর্যাপ্ত। এখন সে দৃশ্য অতীত। নদীর মাঝখানে পলি জমে নতুন চর উঠছে, প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর তীর ঘেঁষে কলকারখানার স্থাপনা যেন নদীর গায়ে পেরেক ঠুকে দিয়েছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, শীতলক্ষ্যার বুক থেকে এখন মাছ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে-কারণ, পানির রঙ কালো, গন্ধ তীব্র, আর অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্য।
শীতলক্ষ্যা নদীর সবচেয়ে বড় সংকট হলো শিল্পবর্জ্যের দূষণ। নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক ডাইং, টেক্সটাইল, পেপার মিল, ওষুধ ও রাসায়নিক কারখানা রয়েছে। এর বেশিরভাগই নদীর দুই তীরে অবস্থিত, যেখান থেকে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রঙ, ডিটারজেন্ট, অ্যাসিড, সোডা, ভারী ধাতু, সীসা, ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক।

বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরই থাকতে হবে ইটিপি। কিন্তু বাস্তবে খুব কম কারখানাতেই ইটিপি আছে। যাদের আছে, তারাও নিয়মিত চালায় না, কারণ এতে খরচ বেশি। ফলে এই কারখানাগুলোর অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি পাইপের মাধ্যমে নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদীর পানি তাই প্রতিনিয়ত কালচে হয়ে উঠছে, কোথাও কোথাও এতটাই ঘন হয়ে গেছে যে মনে হয় তেল বা রঙ মেশানো তরল।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। যার অর্থ—এই পানিতে কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। একসময় এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত, বিশেষ করে শিং, মাগুর, টেংরা, ˆক ইত্যাদি। এখন সেগুলো বিলুপ্ত প্রায়। নদীর বুকে কেবলই ভাসছে বর্জ্য, প্লাস্টিক ও নোংরা কালো পানি।
শুধু শিল্পবর্জ্য নয়, নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলির গৃহস্থালি ও পৌর বর্জ্যও সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে পড়ছে। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল ও অদক্ষ হওয়ায় বৃষ্টির পানি, ময়লা ও গৃহস্থালি বর্জ্য একসঙ্গে মিশে নদীতে প্রবাহিত হয়। ফলে নদীর পানি শুধু নোংরাই নয়, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে উঠেছে। নদীর তীরে বসবাসরত মানুষরা এখন নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ নানা জটিল অসুখে ভুগছেন স্থানীয়রা। একদিকে নদী হারাচ্ছে তার জীববৈচিত্র্য, অন্যদিকে মানবজীবনও পড়ছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেই স্বীকাররা করেন- তারা নিয়মিত পরিদর্শন করতে পারছেন না পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে। নারায়ণগঞ্জে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কিন্তু পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সংখ্যা হাতে গোনা। এছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা পর্যায়ে কোনো স্থায়ী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ফলে ঢাকার সদর দপ্তর থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আসলে তখনই কিছু অভিযান হয়, কিন্তু পরে আবার পরিস্থিতি আগের মতোই থেকে যায়। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিচ্ছেন প্রভাবশালী কারখানার মালিকরা। তাঁরা জানেন, অভিযানের ধারাবাহিকতা নেই, তাই অল্পদিনের জন্য জরিমানা দিলেও আবার বর্জ্য ফেলা শুরু করতে কোনো বাধা থাকে না। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নদী দূষণকারীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পরিবেশের ক্ষতি করে বা নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলে, তবে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শিল্পমালিক বা তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে মামলা বা দণ্ড কার্যকর হয় না। এভাবে দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, নাগরিক সমাজের আন্দোলন বা এনজিওগুলোর দাবিতে প্রশাসন এক-দুই দিনের জন্য অভিযান চালায়। কিন্তু টেকসই কোনো সমাধান দেখা যায় না। ফলে নদী বাঁচানোর উদ্যোগগুলো থাকে ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতীকী।
একটি সংস্থা বা বিভাগ একা শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষা করতে পারবে না, এটি এখন সকলেরই উপলব্ধি। নদীকে রক্ষা করতে হলে বহুমাত্রিক সমšি^ত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রথমত, সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ইটিপি চালু নিশ্চিত করতে হবে। ইটিপি বন্ধ রাখলে কারখানার অনুমোদন বাতিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদীর তীর দখলমুক্ত করতে হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে স্থায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। জনবল, প্রযুক্তি ও বাজেট বাড়ানো জরুরি। চতুর্থত, নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে পারেন নদী রক্ষা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়মিত নদী রক্ষায় তথ্য প্রচার, ক্যাম্পেইন ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালাতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নদী সংরক্ষণবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে আগামী প্রজন্ম পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ শনিবার ‘নদী পরিব্রাজক দল -এর সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে গড়ে উঠা ধাঁধার চর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এই দূষণের বাস্তবচিত্র ক্যামেরাবন্দি করি । যাওয়ার পথে চোখে পড়ে শত শত কারখানা, ইটভাটা ও ডাইং শিল্পের সারি। তাদের পাইপ দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কালো পানি পড়ছে নদীতে। নদীর পাড়ে ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক, রাবার, ময়লা এবং রঙিন বর্জ্য। নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়—যেখানে একসময় ¯স্বচ্ছ পানিতে মাছের দল খেলা করত, সেখানে এখন একরঙা কালো পানির ঢেউ। এই দৃশ্য শুধু পরিবেশবিদদেরই নয়, সাধারণ ভ্রমণপ্রেমীদের মনকেও নাড়া দেয়। এই ভ্রমণই স্পষ্ট করে দেয় যে, দূষণ রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও বড় ভূমিকা দরকার। নদীকে ভালোবেসে যারা নিয়মিত তদারকি করেন, তাদেরকে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে হবে।
সবকিছুর পরও আশার আলো নিভে যায়নি। দেশের অন্যান্য নদী যেমন বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী পুনরুদ্ধারের কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। যদি সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক আন্দোলনের সংযোগ ঘটানো যায়, তবে শীতলক্ষ্যা নদীও আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারে নিয়মিত ড্রেজিং, দূষণকারী শিল্প সরিয়ে নেওয়া, নদীর তীর সবুজায়ন এবং নৌপথ উন্নয়ন কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি নদীর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও মানচিত্র হালনাগাদ করে ভবিষ্যৎ দখল প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
নদী মানে জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং আমাদের অস্তিত্ব। শীতলক্ষ্যা নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদী নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানো। নদীর প্রতি ভালোবাসা মানে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। তাই এখনই সময় সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসার। দখল-দূষণমুক্ত একটি শীতলক্ষ্যা গড়তে হলে সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। নদী যদি বাঁচে, দেশও বাঁচবে। অন্যথায় ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে, আমরাই নিজের হাতে আমাদের নদী ও জীবনধারাকে হত্যা করেছি।
লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, বাংলাদেশ।