ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন: বাংলাদেশে বিদ্যুত খাতে প্রতি বছর অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ, করণীয় কী

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে করা এক সরকারি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতা ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে প্রতি বছর বিদ্যুতের খরচে অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে ভারতের আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তিগুলো পুনরায় আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। রোববার প্রকাশিত সরকার নিযুক্ত একটি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুতের দাম এমন পর্যায়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে যা বাংলাদেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ চুক্তির নকশারই একটি ইচ্ছাকৃত ফল। এটি চুক্তির ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সিস্টেমেটিক যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়।
এই পর্যালোচনাটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেল, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। নির্বাচন হওয়ার কথা ১২ই ফেব্রুয়ারি।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সম্পৃক্ত চুক্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুট করা হয়েছে।
রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিকে ‘রেন্ট এক্সট্রাকশন’-এর সবচেয়ে প্রকট উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চুক্তিগুলো শেখ হাসিনার আমলে জরুরি আইন ব্যবহার করে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, আদানির ভারতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ যুক্তিসংগত মানদণ্ডমূল্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিচ্ছে। যার পরিমাণ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৪-৫ মার্কিন সেন্ট। একই সঙ্গে চুক্তির আওতায় জ্বালানি, মুদ্রা বিনিময় হার ও চাহিদাজনিত প্রায় সব ঝুঁকিই বহন করছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনটি সামিট গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ এবং ভারতীয় রিলায়েন্স পাওয়ার ও জাপানের ‘জেরা’ যৌথভাবে নির্মিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পকেও উল্লেখ করেছে। এগুলোকে বলা হয়েছে ‘চরম অসঙ্গতির উদাহরণ’। কমিটির মতে, এসব চুক্তির শর্ত কোনোভাবেই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে আসতে পারে না; বরং এটি বিদ্যুৎ খাতে একটি গভীর শাসন ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই ভুল সিদ্ধান্তগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়। এগুলো দেখিয়ে দেয় যে, কীভাবে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলারা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিমূল্য ও অপ্রয়োজনীয় চুক্তি দিয়ে বিপুল অতিরিক্ত মুনাফা তৈরি করেছেন, যা পরে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়া হয়েছে।’
আদানি পাওয়ারের একজন মুখপাত্র বলেন, কোম্পানির সঙ্গে কমিটির পক্ষ থেকে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা হয়নি এবং প্রতিবেদন প্রকাশের আগেও তাদের কাছে তা সরবরাহ করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশকে ‘নির্ভরযোগ্য, উচ্চমানের এবং অনুরূপ আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে’ বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ইস্যুতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ধনকুবের গৌতম আদানির নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠী ২০২৪ সালের শেষ দিকে বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয় এবং আদানি পাওয়ার জানায়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে তারা নিয়মিত অর্থ পাচ্ছে। ওই মুখপাত্র বলেন, ‘বড় অঙ্কের পাওনা থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সরবরাহ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি, যখন অন্য অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।’
সামিট গ্রুপ অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর’ বলে দাবি করেছে। তারা জানায়, তাদের মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গত বছর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয়ের দিক থেকে তৃতীয় সর্বনিম্ন হিসেবে র‌্যাংক করেছিল। সামিট আরও বলে, এই প্রকল্পে ‘আন্তর্জাতিক অংশীদার ও ঋণদাতারা যুক্ত, যাদের অত্যন্ত কঠোর যাচাই ও শাসন কাঠামো রয়েছে।’
এস আলম গ্রুপ, রিলায়েন্স পাওয়ার ও জেরা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। উল্লেখ্য, অনিল আম্বানির রিলায়েন্স পাওয়ার তার বড় ভাই মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে আলাদা। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় একমাত্র বিদ্যুৎ ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক ক্ষতি বেড়ে ৪.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে এবং সরকারি ভর্তুকি বেড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহ অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন যে সরকারই আসুক না কেন, জনগণের পক্ষ থেকে দুর্নীতিপূর্ণ ও অতিমূল্য বিদ্যুৎ চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি থাকবে। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট ইতিমধ্যে দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও শাসনব্যর্থতা নিয়ে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
কমিটির এক সদস্য বলেন, তারা আশা করছেন নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক, তারা এই বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো নিয়ে ‘দৃঢ় সিদ্ধান্ত’ নেবে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, চুক্তি পুনঃআলোচনার চেষ্টা আন্তর্জাতিক সালিশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে কমিটির মতে, কিছু না করলে যে খরচ হবে তা আইনি ঝুঁকির চেয়েও বেশি।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭.৭ থেকে ৯.৫ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। যার বড় অংশই ‘টেক-অর-পে’ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ২০০৯ সালের পর থেকে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু ব্যবহার রয়ে গেছে মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ। যদি চুক্তিভিত্তিক দাম কমানো না হয়, তাহলে শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে, যা বাংলাদেশের শিল্পহীনতার ঝুঁকি তৈরি করবে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *