শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি নিরাপদ, মানবিক রাষ্ট্র এবং সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশে আইনের শাসন সুদৃঢ় করতে হবে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের শাসনামলে দেশের মানুষের অধিকার ও অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এর চেয়েও বড় ক্ষতি করা হয়েছিল আমাদের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে বিনষ্ট করে। ঢাকার মিরপুরে নিষ্পাপ শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমান সরকার শিশু ও নারী নির্যাতন কোনোভাবেই বরদাশত করবে না এবং আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ নিশ্চিত করবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন জঘন্য অপরাধের সাহস না পায়।
আজ শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির বাল্যস্মৃতি বিজড়িত দরিরামপুরের নজরুল একাডেমি মাঠের ‘নজরুল মঞ্চে’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ও ‘নজরুল পুরস্কার-২০২৫’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’ প্রতিপাদ্যে প্রায় দুই দশক পর এবার ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে এ বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহবুবুর রহমান এবং স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি নজরুলের অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি, জাতীয় চেতনার প্রতীক এবং জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ। পরাধীন জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের সূচনা ঘটিয়েছিলেন এবং রুচির বিপ্লব এনেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এ প্রজন্মের তরুণদের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। ১৯৭৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় কবির নামাজে জানাজার পর তাঁর লাশবাহী খাটিয়া যারা কাঁধে বহন করেছিলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এছাড়া ১৯৭৯ সালে কবির জন্মজয়ন্তীতে ঢাকার ফার্মগেট থেকে মাজার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত র্যালিতেও শহীদ জিয়া অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। কাউকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান কমে না—এই কালজয়ী সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই সমাজে আজ অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। কবি নজরুলের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিকে বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ১৯১৪ সালে কবিকে আশ্রয়দানকারী কাজীর শিমলা গ্রামের মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহকে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি, মানবমুক্তির দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অগ্রদূত। আজকের বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে সামাজিক মেরুকরণ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে জটিল সময় আমরা অতিক্রম করছি, সেখানে নজরুল আমাদের নৈতিক সাহসের বাতিঘর।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়; এটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক নির্মাণের ক্ষেত্র। তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা পরিহার করে জ্ঞানের গভীরতায় নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন, দ্রোহ মানে ধ্বংস নয়; দ্রোহ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সাহস। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে সংস্কৃতি হবে রাষ্ট্রের আত্মা, গণতন্ত্র হবে জনগণের আস্থা, আর মানবতা হবে রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। পরিশেষে কবি নজরুলের অমোঘ বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের আগামী তারুণ্যের এক হাতে থাকবে প্রেমের বাঁশের বাঁশরী, অন্য হাতে থাকবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রণতূর্য। এই তরুণদের হাতেই দেশ নিরাপদ থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব মো. শরীফুল আলম, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা এবং ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ট্রাস্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কবিপৌত্রী খিলখিল কাজী, ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক (গ্রেড-১) জনাব মো. লতিফুর রহমান শিবলী এবং ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মো. সাইফুর রহমান। অনুষ্ঠান শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপিত হয়। সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ শেষে প্রধানমন্ত্রী ২৫মে ২০২৬ থেকে ২৫মে ২০২৭ সালকে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেন।