শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:
হাওরাঞ্চলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রক্ষার্থে কৃষিখাতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ/সীমিতকরণে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত “জাতীয় কমিটি”-এর দ্বিতীয় সভা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: মোকাব্বির হোসেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (সেবা বিভাগ) মো: সাইদুর রহমান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর বক্তব্য রাখেন। এছাড়া, ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো: জিয়াউদ্দীন এবং সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার খান মো: রেজা-উন-নবী, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো: ইমাম উদ্দীন কবির, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, ময়মনসিংহ বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) জন কেনেডি জাম্বিল, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস.এম.সোহরাব উদ্দিন, বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোঃ মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো: আবদুর রউফ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো: আবু সুফিয়ান, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষে হাওরাঞ্চলে পানি কমে যাওয়ায় রবি শস্য বিশেষ করে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। সর্বোচ্চ ফলনের আশায় অনেক কৃষক অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার করেন, যা হাওরাঞ্চলের মাছ, গবাদিপশু এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ প্রেক্ষাপটে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ/সীমিত করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে যথোপযুক্ত কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে সকলের আন্তরিক ও সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, কার্বোফুরান নামক ক্ষতিকর বালাইনাশক ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাইনাশক ও বিকল্প বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষি সচিব বলেন, বালাইনাশক ব্যবহার সংক্রান্ত বিধিমালা চূড়ান্ত হলে বালাইনাশকের ব্যবহার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ৩৩৫টি জেনেরিক নামের প্রায় ৮১০০টি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের বালাইনাশক বাজারে রয়েছে, যা সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব বলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় কৃষকরা অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এ সমস্যা রোধে তিনি বালাইনাশক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, বালাইনাশকের টক্সিসিটি পরীক্ষার জন্য এনআইবি, বিসিএসআইআর ও বারি-এর ল্যাবরেটরি ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই একমত পোষণ করেছেন। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান ও সমন্বয়ের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন বোরো মৌসুমে হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় বালাইনাশক বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে কৃষিখাতে বালাইনাশক ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হবে।
এ ছাড়া বালাইনাশকের বোতল ও প্যাকেটে সহজ ও স্পষ্ট বাংলায় ব্যবহার নির্দেশিকা সংযুক্ত করে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোতে কৃষকদের জন্য বালাইনাশকের নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
খাদ্য ও পশুখাদ্যে বালাইনাশকের টক্সিসিটি পরীক্ষার জন্য এনআইবি, বিসিএসআইআর ও বারি-এর ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশক, আইপিএম (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) ও জিএপি (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া হাওর অঞ্চলে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বাস্তবায়ন আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।