পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে ছাড় দিতে পারে ইরান

শুভদিন অনলাইন রিপোর্টার:

তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনায় ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ ঘটেছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঠেকাতে চলমান সংঘাত বন্ধে ইসলামাবাদ তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করেছে।
বুধবার (১৬ এপ্রিল) ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভি জানায়, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ইরানি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দিতে তেহরান সফর করেছে। প্রতিনিধিদলটি সেখানে পৌঁছানোর পর সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আসিম মুনিরকে অভ্যর্থনা জানান এবং ‘সংলাপের চমৎকার আয়োজনের’ জন্য পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রেস টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টাও করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার খবর সংগ্রহকারী আল জাজিরার ওসামা বিন জাভেদ জানান, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ‘পারমাণবিক আলোচনার ফ্রন্টে বড় ধরনের অগ্রগতির’ প্রত্যাশা করছেন এবং প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে বার্তা আদান-প্রদান করে যাচ্ছেন।
মূলত ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার সময়সীমা এবং দেশটির কাছে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আলোচনাটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিন জাভেদ বলেন, ‘আমরা জানি, উভয় পক্ষই মূলত সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের সময়সীমা ৫ বছর থেকে ২০ বছরের মধ্যে রাখার বিষয়টি নিয়ে আটকে আছে। তবে এর মাঝামাঝি সমাধানের পথ রয়েছে।’
বিন জাভেদ আরও বলেন, ‘ইরান এই ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ পরমাণু জ্বালানি নিয়ে কী করবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। এখানে বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে; যেমন এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া অথবা একে প্রাকৃতিক ফর্মে নামিয়ে আনা কিংবা ৩ শতাংশে কমিয়ে আনা।’ সূত্রের বরাত দিয়ে ওসামা বিন জাভেদ যোগ করেন, ‘এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে পাকিস্তানিরা তেহরানকে রাজি করাতে সক্ষম হবে।’
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান এই ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ বা মধ্যস্থতা শুরু করে। মধ্যস্থতাকারীরা তিনটি প্রধান ইস্যুতে সমঝোতার জন্য চাপ দিচ্ছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি; হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যা তেহরান কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই সংঘাতে ইরানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এই যুদ্ধ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতকেও নতুন করে উসকে দিয়েছে, যেখানে ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
৮ এপ্রিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা বন্ধ হলেও লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরব সফরে গেছেন। এটি তাঁর আঞ্চলিক সফরের অংশ, যার মধ্যে কাতার ও তুরস্কও রয়েছে। ওসামা বিন জাভেদ এই সফরকে পাকিস্তানের ‘দ্বিমুখী কৌশলের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আল জাজিরার এই সাংবাদিক বলেন, ‘যখন ইরানিরা পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলছে, তখন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি ও কাতারিদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। এর পরের দিন তাঁরা তুরস্ক যাবেন।’ এই সফরের লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য চুক্তির বিরোধিতাকারীদের প্রশমিত করা।
বিন জাভেদের মতে, বিরোধিতাকারীদের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটন ডিসির কিছু অংশের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় পক্ষ হলো ইসরায়েল। এই পক্ষগুলো ‘কোনো শান্তিচুক্তি চায় না এবং এই অঞ্চলে একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধ বজায় রাখতে চায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *